দেশে প্রতি বছরই আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা, আর চিকিৎসার বিপুল ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে হাজারো পরিবার। এই প্রেক্ষাপটে দেশীয় ওষুধশিল্পকে শক্তিশালী করা এবং রোগীদের কিছুটা স্বস্তি দিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরসহ আগের বাজেটগুলোতে ওষুধ তৈরির কাঁচামালে উল্লেখযোগ্য করছাড় দিয়েছে সরকার। নতুন বাজেটে ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধের জন্য আরও ৯টি কাঁচামাল এবং অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই)সহ মৌলিক উপাদান আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য করা হয়েছে। তবে এত বড় করছাড়ের সুফল এখনো সাধারণ রোগীদের কাছে পৌঁছেনি। রাজধানীর মিটফোর্ড, শাহবাগ এবং ক্যান্সার হাসপাতালসংলগ্ন বিভিন্ন ওষুধের দোকান ঘুরে এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জীবনরক্ষাকারী এসব ওষুধের বাজারে বাজেটের কোনো দৃশ্যমান প্রভাব নেই। অধিকাংশ ওষুধই আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ডিজিডিএর প্রাইস কন্ট্রোল কমিটির কার্যক্রম স্থবির এবং নতুন মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় কর ও শুল্ক কমানো হলেও ওষুধের খুচরা দামে তার কোনো প্রভাব পড়ছে না। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ক্যান্সার চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় কমাতে সরকার প্রতি বাজেটেই ওষুধ ও কাঁচামাল আমদানিতে কর-শুল্কে ছাড় দিয়ে আসছে। কিন্তু এই জনবান্ধব উদ্যোগের সুফল রোগীরা আদৌ পাচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তিনি তদারকির ঘাটতিকে মূল সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে আরও বলেন, শুল্কছাড়ের সুবিধা ওষুধের চূড়ান্ত খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণের সঙ্গে কোনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত নয়। ফলে এই সুবিধা সরাসরি রোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করতে ডিজিডিএকে প্রতিটি ব্যাচের উৎপাদন খরচ নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করার ওপর জোর দেন তিনি।
ক্যান্সারের ভয়াবহতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অধীন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি)-এর সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন, যাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। একই সময়ে এ রোগে বছরে মৃত্যুবরণ করছেন প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জন। ক্যান্সারের এই উচ্চপ্রবণতা এবং ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা চাহিদা দেশীয় ওষুধ শিল্পকে ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদনে বড় পরিসরে বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছে। বর্তমানে বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস, ইনসেপ্টা, রেনেটা পিএলসি, হেলথকেয়ারসহ দেশের প্রায় ১৭ থেকে ১৮টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের ক্যান্সার ওষুধ উৎপাদন করছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব দেশীয় প্রতিষ্ঠান মিলেই দেশের ক্যান্সার ওষুধের মোট চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ পূরণ করছে।
বাজেটে শুল্কছাড়ের চিত্র
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধের নতুন উপকরণ এবং ওষুধ তৈরির মূল উপাদান এপিআইসহ মোট ৭৭টি নতুন মৌলিক কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট তুলে নেওয়া হয়েছে। ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় নতুন করে আরো ৯টি মৌলিক কাঁচামাল যুক্ত করা হয়েছে। এসব কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করা হয়েছে। এর আগে ক্যান্সারের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানির ওপর উৎস কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি এবং যন্ত্রপাতি আমদানিতে বড় ছাড় দিয়েছে।
দেশীয় উৎপাদনে দাম কমছে আমদানির তুলনায়
দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায় গত কয়েক বছরে আমদানিনির্ভর ক্যান্সার ওষুধের তুলনায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বেশ কিছু ওষুধের দাম কমেছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খুচরা বাজারে উল্টো কিছু ওষুধের মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জামালপুরের ইনসাফ ফার্মেসির মালিক সোহেল রানা জানান, ক্যান্সার ও তীব্র ব্যথা উপশমে ব্যবহৃত ‘টোরাক্স-১০’ ট্যাবলেটের দাম প্রতি পিস ১২ টাকা থেকে বেড়ে এখন ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আমিনুল ইসলাম বলেন, জটিল রোগের চিকিৎসা খরচ এখন আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
বীকন ফার্মাসিউটিক্যালসের অনকোলজি, বায়োটেক ও পেলিয়াটিভ কেয়ার বিভাগের পরিচালক এবং এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম মাহমুদুল হক পল্লব বলেন, ‘দেশে উৎপাদন বাড়ায় ক্যান্সারের ওষুধের দাম আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে কাঁচামালের বিশ্ববাজারের ওঠানামা এবং স্থানীয় গ্যাস-বিদ্যুৎ ও ডলারের বিনিময় হারের কারণে সব ওষুধের দাম একই অনুপাতে কমানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।’ তিনি আরো জানান, ক্যান্সার চিকিৎসার সর্বাধুনিক পদ্ধতি ইমিউনোথেরাপির খরচ আগে প্রতি ডোজ চার লাখ টাকা থাকলেও দেশীয় উদ্যোগে তা দেড় লাখ টাকায় নেমে এসেছে, যা পার্শ্ববর্তী দেশের চেয়েও কম। তবে খরচ অর্ধেক কমলেও দেড় লাখ টাকা পার ডোজ এখনো সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।’
শুল্কছাড়ের পরও কেন কমছে না ওষুধের দাম
ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবার জন্য শাহবাগের একটি ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, বাজেটে শুল্ক কমার খবর টিভিতে দেখেছি। কিন্তু গত মাসে যে কেমোথেরাপির ফাইল ১২ হাজার টাকায় কিনেছি, আজও সেটির দাম এক টাকাও কমেনি। তাহলে এই ছাড়ের সুবিধা যাচ্ছে কার পকেটে? অন্যদিকে ফার্মেসি মালিকদের দাবি, ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খুচরা মূল্য (এমআরপি) কম নাালে তাঁদের পক্ষে কম দামে ওষুধ বিক্রি করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতির (বিসিডিএস) এক কর্মকর্তা জানান, উৎপাদন খরচ কমলেও কোম্পানিগুলো যদি বোতল বা পাতায় মুদ্রিত মূল্য অপরিবর্তিত রাখে, তাহলে খুচরা বিক্রেতাদের করার কিছুই থাকে না।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য মতে, সরকার ক্যান্সারের ওষুধের কাঁচামাল ও ভ্যাট কমালেও খুচরা বাজারে দাম না কমার মূল কারণ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) থেকে এখনো ওষুধের নতুন দাম পুনর্নির্ধারণ বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। বাজেটে যে ৯টি এইচএস কোডের ওষুধের কাঁচামালের ওপর রেয়াত দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর দাম ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাজেটে শুল্ক মওকুফের সুবিধা সাধারণ রোগীরা কেন পাচ্ছেন না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিজিডিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, কাঁচামাল আমদানিতে কর ছাড়ের ফলে উৎপাদন খরচ কতটা কমেছে এবং সে অনুযায়ী ওষুধের খুচরা মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে শিগগিরই দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডাকা হবে। তাঁরা আরও বলেন, কোনো কোম্পানি যদি সরকারের দেওয়া করছাড়ের সুবিধা নিজস্ব মুনাফা বাড়াতে ব্যবহার করে এবং ওষুধের উচ্চ মূল্য বজায় রাখে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিডিএর প্রাইস কন্ট্রোল কমিটির কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা জরুরি। তাঁদের দাবি, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে নতুন কোনো মূল্য নির্ধারণ না হওয়ায় সরকারের ঘোষিত প্রণোদনার সুফল সাধারণ রোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তাঁরা আরও বলেন, সরকার যে কর-শুল্ক ছাড় দিচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করে প্রতিটি ওষুধের খুচরা মূল্য (এমআরপি) পুনর্নির্ধারণ করে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, যেখানে দেশীয় ক্যান্সার ওষুধ সাশ্রয়ী দামে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে চিকিৎসকেরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে উচ্চমূল্যের বিদেশি বা আমদানিকৃত ওষুধ প্রেসক্রাইব করছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের জেনেরিক নামে ওষুধ লেখার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন বিশেষজ্ঞরা।
ওষুধ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই বিপুল পরিমাণ ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধ দেশে উৎপাদন না করত, সে ক্ষেত্রে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যেত। ক্যান্সার নামের এই মারণব্যাধির হাত থেকে দেশের কোটি দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে বাঁচাতে হলে সরকারের দেওয়া বাজেটের শুল্কছাড়ের কানাকড়ি হিসাবও সাধারণ রোগীর পকেট পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে।
