** পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিটে নয়টি বিল অব এন্ট্রির বিপরীতে প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ টাকার কম রাজস্ব পরিশোধের তথ্য পেয়েছে, ওই রাজস্ব পরিশোধে দাবিনামার পর চূড়ান্ত তাগিদ পত্র জারি করা হয়েছে
** এর আগে দুইটি চালান খালাস পর্যায়ে আটক করে কাস্টমস গোয়েন্দা, এতে ঘোষণা অতিরিক্ত পণ্য পাওয়া যায়, পরে বিচারাদেশে প্রতিষ্ঠানকে অর্থদণ্ড ও জরিমানা করা হয়, রাজস্ব পরিশোধ করে পণ্য খালাস নেয়া হয়
** দুইটি চালানে রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার ও অতিরিক্ত পণ্য পাওয়ায় খালাস নেয়া নয়টি চালান পিসিএ করতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে চিঠি দেয় কাস্টমস গোয়েন্দা, কর্মকর্তাদের শাস্তির সুপারিশ করা হলেও শাস্তি দেয়া হয়নি
বন্ড লাইসেন্স নেই। তবুও বন্ড সুবিধার আদেশ অনুযায়ী রেয়াতি সুবিধায় পণ্য আমদানি করে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রেয়াতি সুবিধায় পণ্য খালাসও নেয়া হয়েছে। রেয়াতি সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নয়, এরপরও রেয়াতি সুবিধা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা মিথ্যা ঘোষণার সামিল। এখানেই শেষ নয়, রেয়াতি সুবিধার পাশাপাশি ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য আমদানি করা হয়েছে। কয়েকটি চালান রেয়াতি সুবিধায় খালাসও নেয়া হয়েছে। কিন্তু কাস্টমস কর্মকর্তারা দেখেও না দেখার ভান করেছে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খালাস পর্যায়ে চালান আটক করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা। আটকের পর রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহারের প্রমাণ তো পেয়েছে, সঙ্গে ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য পেয়েছে।
ইলেকট্রনিকস পণ্য আমদানি, উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভিসতা ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের বিরুদ্ধে রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার ও ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য আমদানির প্রমাণ পেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বিচারাদেশে প্রতিষ্ঠানকে অর্থদণ্ড ও জরিমানা করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। আবার আগে খালাস নেয়া নয়টি চালান পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট (পিসিএ) করে রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। নয়টি চালানে প্রায় এক কোটি ১১ লাখ টাকা পরিহার করা রাজস্ব পরিশোধে প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামার পর চূড়ান্ত তাগাদাপত্র দেওয়া হয়েছে। আর রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহারে সহায়তা করা অর্থাৎ শুল্কায়নের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের শাস্তির সুপারিশ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা। কিন্তু কোন কর্মকর্তাকে শাস্তি দেয়া হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহারের বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
এনবিআর সূত্রমতে, কাস্টমস গোয়েন্দার চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনারকে পৃথক দুইটি চিঠি দেওয়া হয়। যাতে বলা হয়েছে, ভিসতা ইলেকট্রনিকসের দুইটি বিল অব এন্ট্রিতে আমদানি করা পণ্য চালান শুল্কায়ন পরবর্তী খালাস পর্যায়ে আটক করা হয়েছে। যাতে একটি চালানে পণ্যের মধ্যে ছিলো—৩২ ইঞ্চি টু-কে এইচডি এলইডি ডিসপ্লে প্যানেল ও ৪৩ ইঞ্চি ফোর-কে এইচডি এলইডি ডিসপ্লে প্যানেল। তবে প্রতিষ্ঠানের ঘোষণার চেয়ে বেশ কিছু পাওয়া যায়, যার ওজন ৩৯৩ দশমিক ৮৮ কেজি, যা মোট পণ্য অপেক্ষা ১৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি। অপর চালানে একই পণ্য এবং ঘোষণার অতিরিক্ত ৫৩৯ দশমিক ৮৪ কেজি বেশি পণ্য পাওয়া যায়, যা মোট পণ্য অপেক্ষা ১৯ দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, দুইটি চালান শুল্কায়ন করে খালাস নেয়া হচ্ছে। তবে রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার ও ঘোষণার অতিরিক্ত পণ্য রয়েছে—এমন গোপন সংবাদ থাকায় কাস্টমস গোয়েন্দা চালান দুইটি লক করে এবং খালাস পর্যায়ে তা আটক করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি সিপিসি এন১২ সুবিধায় শূন্য শতাংশ কাস্টম ডিউটি দিয়ে শুল্কায়ন করেছে। কিন্তু চালানটি এসআরও-২১৪ (১.৭.২০১৫) এর আওতায় সিপিসি সুবিধা পাওয়ার যোগ্য ছিলো না। দুইটি চালান কিভাবে কাস্টমস কর্মকর্তারা রেয়াতি সুবিধায় খালাস দিয়েছে—সেসব কাস্টমস কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠিতে অনুরোধ করা হয়। একইসঙ্গে দুইটি চালানে রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার ও অতিরিক্ত ঘোষিত পণ্য আমদানি করায় ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনারকে অনুরোধ করা হয়। তবে পরবর্তীতে কমিশনার দুইটি চালানের বিচারাদেশ দিয়েছে। এতে একটি চালানে ২৭ লাখ ৯২ হাজার ২৪১ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়, রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার করায় ৬০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, ৫ লাখ টাকা জরিমানাসহ ১ কোটি ৮ লাখ ৬ হাজার ১০৪ টাকা রাজস্ব আদায়ে বিচারাদেশ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানকে এই টাকা পরিশোধ করে পণ্য খালাস নিয়েছে। অপর চালানে একইভাবে রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার প্রমাণিত হওয়ায় অর্থদণ্ড ও জরিমানা আরোপ করে বিচারাদেশ দেওয়া হয়। যাতে রাজস্ব ফাঁকি ৪২ লাখ ৬ হাজার ৩৪৫ টাকা, ৮৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা বিমোচন জরিমানা আরোপ করা হয়। বিচারাদেশ শেষে সঙ্গে সঙ্গে একটি চালানে অনিয়ম স্বীকার করে রাজস্ব পরিশোধ করে প্রতিষ্ঠান চালানটি খালাস নিয়েছে। পরে দ্বিতীয় চালান খালাস নেয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে অর্থদণ্ড ও জরিমানা করা হলেও শুল্কায়নের সঙ্গে জড়িত অর্থাৎ রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা করা কোন কর্মকর্তাকে শাস্তি দেয়নি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এমনকি কাস্টমস গোয়েন্দাকে কোন বিষয়ে জানানো হয়নি বলে জানা গেছে।
সূত্রমতে, দুইটি চালানে রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহার পাওয়ায় এর আগে একইভাবে আমদানি করা সাতটি চালানের পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট (পিসিএ) করে ফাঁকি উদ্ঘাটন করতে কাস্টম হাউসকে চিঠি দেয় কাস্টমস গোয়েন্দা। পরে কাস্টম হাউস পিসিএ করা হলে সাতটি চালানে অনিয়ম উঠে আসে। যাতে সাতটি চালানে একই কায়দায় প্রায় এক কোটি ১১ লাখ টাকা রাজস্ব অনিয়ম পায় কাস্টম হাউস। পরে প্রতিষ্ঠানকে পৃথক সাতটি দাবিনামা জারি করা হয়। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি দুইটি দাবিনামার টাকা পরিশোধ করেছে। বাকি সাতটি দাবিনামা অনুযায়ী রাজস্ব পরিশোধ করা হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নভেম্বরের শেষে চূড়ান্ত তাগাদাপত্র দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানকে সাতদিনের সময় দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠান এখনো কোনো রাজস্ব পরিশোধ করেনি। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজস্ব পরিশোধ না করলে কাস্টমস আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২০২ ধারা অর্থাৎ ব্যাংক হিসাব জব্দসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি কাস্টম হাউস।
এনবিআর সূত্রমতে, ভিসতা ইলেকট্রনিকস লিমিটেড গাজীপুরের কালিয়াকোর এলাকার বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক অবস্থিত একটি প্রতিষ্ঠান। পণ্য খালাস স্থগিত ও রেয়াতি সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠার পর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এনবিআরের আবেদন করা হয়েছে। যাতে দাবি করা হয়, হাইটেক পার্ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসআরও অনুযায়ী রেয়াতি সুবিধাপ্রাপ্ত হবে। কিন্তু হাইটেক পার্ক এলাকাকে এনবিআর বন্ডেড এলাকা ঘোষণা করেনি। যার ফলে প্রতিষ্ঠান এই রেয়াতি সুবিধা পাবে না জানানো হয়েছে। বিচারাদেশ দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠান আপিলাত ট্রাইব্যুনালে যায়। তবে ট্রাইব্যুনাল বিচারাদেশে দাবি করা শুল্ককর ও অর্থদণ্ডের ৫ শতাংশ নগদ ট্রেজারি এবং ১০ শতাংশ নি:শর্ত ব্যাংক গ্যারান্ট্রি জমাদানের কথা। কিন্তু জমা না দেওয়ায় আপিল খারিজ করে দেওয়া হয়। তবে প্রতিষ্ঠানের দাবি, তারা আপিলাত ট্রাইব্যুনাল থেকে রায় পেলেও তৎকালীন কাস্টম কমিশনার তা আমলে নেননি।
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও কাস্টমস গোয়েন্দার একাধিক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে জানিয়েছেন, রেয়াতি সুবিধা কোনভাবে প্রতিষ্ঠান পাবে না। কিন্তু কর্মকর্তারা পণ্য শুল্কায়নের সময় ভালো করে কাগজপত্র যাচাই না করেই পণ্য খালাস দিয়েছে। যে এসআরও-তে রেয়াতি সুবিধা দাবি করা হয়েছে—সেই এসআরও এই প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য নয়। এরপরও প্রতিষ্ঠান নানানভাবে প্রভাব খাটিয়ে পণ্য খালাস নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। অবশেষে শুল্ককর, জরিমানা ও অর্থদণ্ড পরিশোধ করে পণ্য খালাস নিয়েছে।
অপরদিকে, ভিসতা ইলেকট্রনিকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লোকমান হোসেন আকাশ বলেন, এসআরও জটিলতা রয়েছে। এসআরও বাতিল করেনি, সংশোধন হচ্ছে। আমরা হাইটেক পার্ক অথরিটির মাধ্যমে আবেদন করেছি। তিনি দাবি করেন, এনবিআর থেকে প্রথমে আমাদের পণ্য ছাড়াতে নির্দেশ দিয়েছে। আবার ট্রাইব্যুনাল থেকে রায় পাওয়ার পর জুলাই-আগস্ট আন্দোলন চলে এসেছে। কিন্তু কাস্টম কমিশনার তা পরিপালন করেনি। প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা করে কন্টেইনার ডেমারেজ আমরা কয়দিন দেবো। আবার এলসি করতে পারতেছি না। কিন্তু আমার কোম্পানি তো চালাতে হবে। সেজন্য জরিমানা দিয়ে আমরা খালাস নিয়েছি। পিসিএ করার পর আপনারা দুইটি চালানে মেনে নিয়ে রাজস্ব জমা দিয়েছেন।
বাকি সাতটি জমা দেননি—এই বিষয়ে তিনি বলেন, তারা আমাকে এআইটি চার্জ করেছে। কিন্তু আমার তো এআইটি অব্যাহতি রয়েছে। আর ভ্যাট তো আমরা পরিশোধ করেছি, আবার কেনো দেবো? দাবিনামায় এআইটি ও ভ্যাট ধরা হয়েছে। আমরা কাস্টমসকে বলেছি, ভ্যাট ও এআইটি বাদ দিয়ে জানালে আমরা সেই টাকা দিয়ে দেবো। আমাদের আর কোনো চিঠি দেয়নি। এসআরও বিষয়ে তিনি বলেন, পুরো হাইটেক পার্ক বন্ডেড ওয়্যারহাউজের আওতায়। কিন্তু এনবিআর সেখানে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ করেনি। বিষয়টি আমরা জানি না। তবে হাইটেক পার্ক অথরিটি বলেছে, এআইটি ও ভ্যাট না দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে পারবেন। বিক্রি করার সময় তা দিয়ে দিবেন। আমরা বিক্রি করার সময় প্রতিমাসে ভ্যাট দিয়ে দেয়। আর এআইটি তো আমরা অব্যাহতিপ্রাপ্ত। ফলে আমাদের এআইটি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। শুধু আমরা কাস্টমস ডিউটি দেবো।