যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতির প্রভাব মোকাবিলায় কৌশল নিচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আমদানি নীতি পরিবর্তন করে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার তুলে দেওয়া হবে, যাতে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি সহজ হয়। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও অন্যান্য ব্যবসা সহজ করারও উদ্যোগ নেবে সরকার। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা শুল্কহার কমিয়ে আনারও উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাড়ানো হবে অভ্যন্তরীণ দক্ষতা। অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্কনীতি ঘোষণার পরই বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) সকালে ছুটির মধ্যে এ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বাংলাদেশে এর প্রভাব ও উত্তরণের উপায় নিয়ে বৈঠক করেছেন।এর আগে বৃহস্পতিবার ( ৩ এপ্রিল ) সকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক রিভিউ করছে। সকাল ৮টা ৩২ মিনিটে ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে এক প্রেস বিবৃতিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দ্রুত শুল্কহার যুক্তিসংগত করার বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখছে, যা বিষয়টি সমাধানের জন্য জরুরি।’
জানা গেছে, বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা তার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে এ বিষয়ে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে বাণিজ্য উপদেষ্টা আগামী রোববার ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এই বিষয়ে বৈঠক করবেন। ওই বৈঠকে বাণিজ্য সচিবও উপস্থিত থাকবেন।যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত নতুন নীতির আওতায় বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়।
নতুন এ শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে। বেকারত্ব বেড়ে সৃষ্টি হতে পারে মন্দা। এতে চাহিদা কমে আসবে বিশ্ববাজারে, যা বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এজন্য সরকারকে এখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোভিড-১৯ ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কাটতে না কাটতেই ট্রাম্প প্রশাসনের এই শুল্ক যুদ্ধের প্রভাবে পড়তে যাচ্ছে বিশ্বে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে। এই শুল্ক যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী নতুন মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেছেন, ধারণা করা হচ্ছে, এই ট্যারিফ (শুল্ক) আরোপ করায় আমেরিকার অর্থনীতিতে মন্দা আসবে। সবকিছুর দাম বাড়বে। এতে ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতা কমতে পারে। ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কমার আশঙ্কা রয়েছে।বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী চাহিদা কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের রপ্তানিতে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত নতুন শুল্কনীতি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, ভারত ও চীনের তুলনায় বাংলাদেশের শুল্কহার বেশি হওয়ায় এই নতুন কাঠামোতে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণা করা নতুন শুল্কনীতি খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়েছে সরকার। এই শুল্কনীতির প্রভাব কী হতে পারে সেটি পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই পর্যালোচনায় বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপর প্রভাব কী হতে পারে, বাংলাদেশের সরকারের করণীয় কী, এসব দেখা হবে।তিনি বলেন, ‘সরকার সেইফগার্ড ও কারেকটিভ মেজারস দুটোই নেবে। কারেকটিভ মেজারস হিসেবে দ্রুতই আমদানি নীতিতে পরিবর্তন আনা হবে। আমেরিকার জন্য যে বোনাফাইড নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার আছে সেটি কয়েকদিনের মধ্যেই তুলে নেওয়া হবে।’
বাণিজ্য সচিব বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার(ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে রপ্তানিতে নগদ সহায়তা দিতে পারে। তবে বাংলাদেশ যেহেতু ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বের হয়ে আসবে, ফলে ২০২৬ সালের পরে আর নগদ সহায়তা দেওয়া যাবে না। সেজন্য ধাপে ধাপে নগদ সহায়তা কমানো হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশের নগদ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্তে অন্য দেশ কাউন্টার মেজারস নিতে পারে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তির (টিকফা) রয়েছে সে অনুযায়ীও এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসীভাবে পুরো বিশ্বের ওপর নতুন শুল্ক নীতি নিয়েছে।’ফলে বাংলাদেশের এখানে আগ্রাসী হওয়ার কিছু নেই। এখন একমাত্র পথ হচ্ছে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা। সেই উদ্যোগ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে,’ বলেন বাণিজ্য সচিব।
মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, ‘২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল করে। তখন আমরা মুষড়ে পড়েছিলাম। কিন্তু দেখা গেছে বাণিজ্যে ততটা প্রভাব পড়েনি। বরং বাণিজ্য বেড়েছে। এর কারণ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি। এখনও নতুন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অভ দ্য ইউনাইটেড স্টেট ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (ইউএসটিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১০.৬ বিলিয়ন ডলার। এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ২.২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৮.৪০ বিলিয়ন ডলারের।ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে প্রধানত কৃষিপণ্য (খাদ্যশস্য, বীজ, সয়াবিন, তুলা, গম ও ভুট্টা), যন্ত্রপাতি, লোহা ও ইস্পাত রপ্তানি হয়ে থাকে। আর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, জুতা, টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক সামগ্রী এবং কৃষিপণ্য।