নিত্যপণ্য আমদানিতে ভারতনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসছে সরকার। পাশাপাশি নিত্যপণ্য আমদানিতে লাগাম টানা হচ্ছে। এজন্য চাহিদা মেটাতে পণ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও উৎপাদনে স্বনির্ভরতার দিকে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভারতের বিকল্প বাজারও খোঁজা হচ্ছে। কোনো কারণে দেশে উৎপাদন মার খেলে প্রয়োজনের সময় নিত্যপণ্য সরবরাহ নিয়ে সরকার যাতে বেকায়দায় না পড়ে সেজন্য এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এতে নিত্যপণ্যের সংকট তৈরির সঙ্গে জড়িত দেশি ও বিদেশি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও কমবে।
নিত্যপণ্য আমদানিতে একক উৎস ও একক দেশের ওপর নির্ভরতা কাটাতে সম্প্রতি সরকারকে বিকল্প দেশ খোঁজার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও (বিটিটিসি)। ইতোমধ্যে বিটিটিসি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। সেখানে বেশকিছু দেশ চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে দেশে উৎপাদন ভালো হলে ভারতের ওপর নির্ভর করতে হয় না। তারা উদাহরণ দিয়ে বলেন, চলতি মৌসুমে পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়েছে। ফলে রমজান মাস এবং ঈদের সময় দেশবাসী ৪০ টাকা কেজি পেঁয়াজ কিনেছে। যা গত কয়েক বছরের মধ্যে রেকর্ড। অন্যান্য বছর পেঁয়াজের জন্য ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছে। তারা মর্জিমাফিক শুল্ক আরোপ করেছে। অনেক সময় পণ্যটি রপ্তানিতে নানা কূটকৌশলে বাধাও দিয়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারে। আকাশছোঁয়া দামে ক্রেতাকে পেঁয়াজ কিনতে হয়েছে। চাল, আলু, পেঁয়াজ, ডাল এবং আদা ও রসুনসহ নিত্যপণ্য আমদানি করে থাকে সরকার। এতদিন যার বেশির ভাগই এসেছে ভারত থেকে। কৃষি বিভাগ, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পার্শ্ববর্তী দেশ এবং নিকট প্রতিবেশী হিসাবে আমদানি খরচ কম পড়ায় ভারত ও মিয়ানমার থেকে যে কোনো নিত্যপণ্য আমদানিকে সরকার অগ্রাধিকার দেয়। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একাধিক স্থলবন্দর থাকায় সড়কপথে কম সময়ে নিত্যপণ্য আমদানি সুবিধা রয়েছে। এই সুযোগটাই কাজে লাগায় ভারত। তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পণ্য রপ্তানিতে কারসাজি করে থাকে। অনেক সময় তারা ইচ্ছে করে রপ্তানি বন্ধ রাখে। নিত্যপণ্য নিয়ে কূটচালের সঙ্গে দুই দেশের অসাধু ব্যবসায়ীদের হাত রয়েছে। দীর্ঘকাল ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পৃক্ত থাকায় তাদের মধ্যে এক ধরনের সখ্য গড়ে উঠছে। ফলে তারা পরিকল্পিতভাবে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। এতে নিজেরা অতি মুনাফা করে, একই সঙ্গে সরকারকেও সমস্যায় ফেলে। এমন বাস্তবতায় এসব বন্ধ করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসাবে দেশের চাহিদামতো পণ্য উৎপাদনে গুরুত্বারোপের পাশাপাশি তা সংরক্ষণ ব্যবস্থায় জোর দিচ্ছে। এছাড়া নিত্যপণ্যের বিকল্প বাজার নিয়ে চিন্তা করছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টন। উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টন। চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদন হলেও প্রায় ৩৫ শতাংশ আলু সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়। ফলে বাজারে আলুর দাম হু হু করে বাড়ছে। একই অবস্থা পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও। দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ টন। চলতি বছর উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ টন। প্রায় ১০ লাখ টন বেশি উৎপাদন করেও চাহিদা ঠিক রাখা যাচ্ছে না। কারণ প্রায় ৪০ শতাংশ পেঁয়াজ সংরক্ষণের অভাবে পচে যায়। ফলে সৃষ্টি হয় ঘাটতি। ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বিদেশ থেকে আমদানি করে বাজার ঠিক রাখতে হচ্ছে। এই দুটি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বলতে গেলে একমাত্র উৎস ছিল ভারত। কিন্তু গত বছর ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ রাখায় বাজারে সংকট তৈরি হয়। যে কারণে একমাত্র উৎস বা সোর্সের ওপর নির্ভর না হয়ে সরকার পাকিস্তান, চীন, মিসর ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে পণ্য দুটি যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে ডালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন। চলতি বছর দেশে উৎপাদন হয়েছে ১০ লাখ টন। প্রায় ১৬ লাখ টন ডাল আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। মসুর, মুগ, মাসকলাই, খেসারি, অ্যাংকর, বুটের ডাল, ছোলা ও মোটা ছোলা আমদানি করে সরকার। আগে ভারত থেকে ডাল আমদানি হয়েছে। এবার বিকল্প হিসাবে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং নেপাল থেকে ডাল আমদানি করবে সরকার। ইতোমধ্যে আমদানি শুরু হয়েছে বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রসুনের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬ লাখ টন, যার মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার টন দেশে উৎপাদিত হয়। বাকি ৪ লাখ ১০ হাজার টন আমদানি করতে হয়। অতীতে ভারত থেকেই রসুনের বেশি আমদানি হতো, তবে বর্তমানে মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মিসর থেকেও রসুন আমদানি হচ্ছে। একইভাবে, আদার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন, যার মধ্যে ২ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয় এবং বাকি ২ লাখ টন আমদানি করা হয়। চীন ও মিয়ানমার থেকে এই চাহিদার ৯৬ শতাংশ আদা আমদানি করা হচ্ছে। এছাড়া, সরকার বিকল্প বাজার খুঁজতে কাজ করছে।