ব্যান্ডউইডথের ৫০ শতাংশের বেশি সামিটের দখলে

আইসিটি ও টেলিকম খাতে এখনো সামিট গ্রুপের একচ্ছত্র আধিপত্য বিরাজমান। প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রত্যক্ষ সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ সুবিধা পেয়েছে। নীতিমালা লঙ্ঘন করে সামিটকে দেওয়া হয় ৬টি লাইসেন্স, যা বাজার প্রতিযোগিতার বিপরীতে যায়। বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথের ৫০ শতাংশেরও বেশি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সামিটকে একচেটিয়া আইসিটি খাত-সংশ্লিষ্ট সুবিধা দেওয়ার ফলে ইন্টারনেট খাত ভারতনির্ভর হয়ে পড়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। সংশ্লিষ্ট মহল ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অদৃশ্য কারণে সামিট গ্রুপ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। আওয়ামী শাসনামলে প্রতিষ্ঠানটি অন্যতম সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। নতুন সরকার গঠনের পর বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খানের ভাই, গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ফারুক খান। একই বছর সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সামিট গ্রুপ টেলিকম খাতে প্রবেশ করে এবং দেশের ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপনের জন্য বিটিআরসি থেকে এনটিটিএন (ন্যাশনাল টেলিকম ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক) লাইসেন্স পেয়ে যায়। সেখান থেকেই শুরু হয় সামিটের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথচলা।

সামিট শুরুতে এনটিটিএন লাইসেন্স নিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও দ্রুতই আইটিসি, আইআইজি ও আইএসপি লাইসেন্স অর্জন করে। নীতিমালা লঙ্ঘন করে সরকার এসব লাইসেন্স প্রদান করে, ফলে সামিট বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে।এ অবস্থায় সামিট গ্রুপ দেশের টেলিকম খাতে বিপুল বিনিয়োগ করে এবং কয়েক বছরের মধ্যেই শত শত কোটি টাকা মুনাফা করতে থাকে। এই মুনাফার বড় অংশই ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় ব্যবহৃত হয়, যা পতিত হাসিনা সরকারকে আরো শক্তিশালী করতে সহায়তা করেছিল। সামিটের এই অনৈতিক উত্থান ও আধিপত্য কায়েমের মাধ্যমে দেশের ইন্টারনেট খাতকে ভারতনির্ভর করে ফেলা হয়, যা আজ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

২০১২ সালে সাবমেরিন ক্যাবলের বিকল্প হিসেবে ভারত থেকে ব্যান্ডউইডথ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি। তবে বিটিআরসির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আইটিসি গাইডলাইনের অনুযায়ী, কমিশন সর্বোচ্চ তিনটি আন্তর্জাতিক টেরিস্ট্রিয়াল ক্যাবল (আইটিসি) সিস্টেম ও সেবার লাইসেন্স প্রদান করতে পারে, যা ২০১০ সালের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ নীতিমালার আওতায় এবং নির্ধারিত নির্দেশিকার শর্ত অনুযায়ী হয়ে থাকে। এছাড়া, সরকার প্রয়োজনে আইটিসি লাইসেন্সের সংখ্যা কমানোর অধিকার সংরক্ষণ করে।

কিন্তু এই নির্দেশনা উপেক্ষা করে ২০১২ সালে ৬টি প্রতিষ্ঠানকে আইটিসি লাইসেন্স দেওয়া হয়, যেখানে সামিট পঞ্চম স্থানে ছিল। ৮১.৮৩ নম্বর পেয়ে সামিট এবং ৮০.১৯ নম্বর পেয়ে ষষ্ঠ স্থানে থাকা ফাইবার এট হোম লাইসেন্স পায়। ২০০৯ সালে এনটিটিএন ও ২০১২ সালে আইটিসি লাইসেন্স পাওয়ার মাধ্যমে সামিট গ্রুপ কার্যত টেলিকম খাতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

ব্যান্ডউইডথ সরবরাহের আনুপাতিক নীতিমালাও লঙ্ঘন

বিটিআরসির আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) লাইসেন্সিং নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, কোনো অপারেটর দেশের মোট ব্যান্ডউইডথের ৬০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করতে পারবে না। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকার ভারত ও নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে এই নীতিমালা শিথিল করে, যার ফলে ভারত থেকে অনির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যান্ডউইডথ আমদানির সুযোগ তৈরি হয়। এতে দেশ ক্রমশ ভারতনির্ভর হয়ে পড়ে।এই শিথিলতার ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসসিপিএল (বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড)-এর সক্ষমতা উপেক্ষা করে সামিটসহ অন্যান্য আইটিসি প্রতিষ্ঠান ভারতের ব্যান্ডউইডথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। এতে অনেক আইআইজি প্রতিষ্ঠান ভারতীয় ব্যান্ডউইডথ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, যা দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোকে একক দেশের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।

বিটিআরসির একটি সূত্র জানিয়েছে, কিছু আইআইজি প্রতিষ্ঠান তাদের শতভাগ ব্যান্ডউইডথ ভারতের মাধ্যমে ব্যবহার করছে, যা বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে।

বাড়ছে ভারত থেকে ব্যান্ডউইডথ আমদানি

২০২১ সালে সরকারি সক্ষমতার ৭০ শতাংশ ব্যান্ডউইডথ ব্যবহৃত হলেও ২০২৫ সালে এসে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। বিটিআরসির সূত্র অনুযায়ী, প্রতি বছর ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে এবং বর্তমানে ভারত থেকেই আসছে দেশের বেশিরভাগ ব্যান্ডউইডথ।এদিকে সরকারি ব্যান্ডউইথড অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, যার ফলে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর বিদেশনির্ভরতা আরও গভীর হচ্ছে।

ভারতের সঙ্গে মিলে দেশবিরোধী ডিজিটাল ট্রানজিটের ষড়যন্ত্র

বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ব্যান্ডউইডথ রপ্তানির নীলনকশা তৈরি করেছিল সামিট। এর আওতায় ত্রিপুরা, অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মিজোরাম, মনিপুর, মেঘালয় ও নাগাল্যান্ড— এই রাজ্যগুলোতে ব্যান্ডউইডথ সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। এমন উদ্যোগে সরাসরি লাভবান হতো ভারত ও সামিট; কিন্তু বাংলাদেশের টেলিকম খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতো।বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই চুক্তি বাস্তবায়িত হতো, তাহলে বাংলাদেশের ডিজিটাল হাব হয়ে ওঠার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হতো। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এবং পলাতক শেখ হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশনায় এই চুক্তি কার্যকরের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তবে হাসিনা সরকারের পতনের পর সম্প্রতি বিটিআরসি এই চুক্তিটি বাতিল করেছে।খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় স্বার্থবিরোধী এমন কার্যক্রমের জন্য সামিটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যা এখনো করা হয়নি।

সামিটের হাতে প্রাইভেট সাবমেরিনের লাইসেন্স

৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী-ঘনিষ্ঠ সামিট গ্রুপের ক্ষমতা খর্ব করার জন্য বিটিআরসি কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। রাজনৈতিক বিবেচনায় সাবমেরিন ক্যাবলের লাইসেন্স বাতিল করার ব্যাপারেও এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং সামিট এখন খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে অবস্থান নিতে যাচ্ছে।আইটিসি, এনটিটিএন, আইআইজি, এনআইএক্স, সাবমেরিন এবং টাওয়ার শেয়ারিংসহ ৬টি লাইসেন্স হাতে নিয়ে সামিট একাধিপত্য বিস্তার করেছে, যা আওয়ামী সরকারের পতনের পরও অক্ষুণ্ন রয়েছে। এর ফলে গ্রাহকরা সামিটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়তে পারে, যা বাজারে ব্যবসায়িক সাম্য প্রতিষ্ঠার নীতির বিপরীত।

ইন্টারনেট খাতে ৫০ শতাংশের বেশি সামিটের নিয়ন্ত্রণে

খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো এত বেশি ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠা একটি কৌশলগত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল স্বাধীনতাকে গুরুতরভাবে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, বিশেষ করে যদি দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপড়েন বা উত্তেজনা তৈরি হয়।যদি কোনো কৌশলগত কারণে ভারত আইটিসি সংযোগ সীমিত বা বন্ধ করে দেয়, তবে বাংলাদেশের ইন্টারনেট কার্যক্রম বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে, যা দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে চ্যালেঞ্জে ফেলবে।

মন্ত্রণালয়ের নথি থেকে জানা গেছে, সরকারের নিজস্ব সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে বাংলাদেশের ইন্টারনেটের প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ করা হচ্ছে ভারত থেকে, যার ৫০ শতাংশের বেশি সামিট গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। ফলে দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামো একক নির্ভরতার ঝুঁকিতে পড়েছে, যা সরাসরি ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে— সামিট গ্রুপের এই একচ্ছত্র আধিপত্য কাদের স্বার্থে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেন এখনো এই গুরুতর নিরাপত্তা ইস্যুতে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না!

সামিট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে সামিট টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ আল ইসলাম বলেন, ‘সামিট তার যোগ্যতা দিয়েই এসব লাইসেন্স পেয়েছে এবং বিটিআরসি একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই লাইসেন্স প্রদান করেছে।’তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, এতে ভারতের ওপর এক ধরনের নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়িক দিক থেকে চিন্তা করলে ভারতের পক্ষ থেকে ইন্টারনেন বিচ্ছিন্ন করার কথা নয়।তিনি আরও বলেন, ‘একই প্রতিষ্ঠানের ৬টি লাইসেন্স থাকলে এই খাতে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে; তবে সামিট এমন কিছু করছে না।’রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের সুবিধা অনেকেই পেয়ে থাকে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারি কর্তৃপক্ষের মতামত

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পলিসি অ্যাডভাইজর ফাইজ তাইয়েব আহমেদ বলেন, “সরকারের লক্ষ্য হলো দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামোকে একক নির্ভরতা থেকে মুক্ত করা। এই উদ্দেশ্যে বিএসসিপিএল-এর সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে বিকল্প সাবমেরিন ক্যাবল পথের দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং বিভিন্ন ইন্টারনেট পয়েন্টে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। এছাড়া, সিঙ্গেল পয়েন্ট অব ফেইলিউর থেকে মুক্তি পেতে বিটিআরসির পলিসি পরিবর্তনও করা হতে পারে।”

বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসলাম হোসেন বলেন, “আমাদের সক্ষমতা রয়েছে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করার। ভারত থেকে ব্যান্ডউইডথ না আনলে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। অন্যান্য দ্রব্য-পণ্যও তো আমদানি বন্ধ রয়েছে, তাহলে ব্যান্ডউইডথ কেন আমদানি করতে হবে? অব্যবহৃত ব্যান্ডউইডথ কম দামে বিএসসিপিএল বিক্রির চেষ্টা করছে।”

** সামিট পাওয়ারের উৎসে করফাঁকি ১১১২ কোটি টাকা
** করফাঁকির তদন্ত: সাত কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর স্থগিত

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!