নামবিহীন গ্রুপ সিট বুকিংয়ের মাধ্যমে মজুতদারি করার কারণে বিমান টিকিটের মূল্য ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ, প্রকৃত মূল্য ১০০ টাকা হলে সিন্ডিকেটের কারণে তা বেড়ে ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে গ্রাহকদের বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে, যার কারণে ওমরাহ যাত্রী, বিদেশগামী শ্রমিক, শিক্ষার্থী, প্রবাসী এবং ভ্রমণকারীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) এক চিঠি সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। যা অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে, অর্থ উপদেষ্টাকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
জানা গেছে, বর্তমানে ষাট হাজারেরও বেসি সিট এয়ারলাইন্সগুলো অবৈধভাবে ব্লক করে রেখেছে। যার ফলে সব রুটের টিকিট সংকট দেখা দিয়েছে। এতে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে চলমান অন্যতম বড় সমস্যা এয়ার টিকিটের অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও আকাশপথের যাত্রীদের স্বার্থ সংরক্ষণে বিমান টিকিটের অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি রোধে ১০টি নির্দেশনা দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
আটাব সভাপতি আবদুস সালাম আরেফ বলেন, সাদা কাগজে এই ধরনের একটা চিঠি দিয়ে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব না। এজন্য আইনের প্রয়োগ করতে হবে। যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে। নয়তো সিন্ডিকেট যারা করছে তাদের থামানো যাবে না। তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়েই যাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সমস্যায় পড়েছি, এখন সমাধানের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। তাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয়েছি। তারা এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করেছে হয়তো।অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, এয়ারলাইন্সগুলো নামবিহীন আসন গ্রুপ ব্লক ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এয়ার টিকিটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। এবং এই প্রক্রিয়ায় মূল্য বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তাই এই সিন্ডিকেট ভেঙে মূল্য বৃদ্ধি বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে অর্থ উপদেষ্টার কাছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে নামবিহীন আসন গ্রুপ ব্লক বন্ধ করা ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এয়ার টিকিটের কৃত্রিম সংকট ও মূল্য বৃদ্ধি বন্ধ করা এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সেক্টরে এয়ার ফেয়ারের সর্বোচ্চ সিলিং পুনর্নির্ধারণ করে যাত্রীদের জন্য সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতে অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এয়ার টিকিটের অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি। এই মূল্য বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো নামবিহীন গ্রুপ টিকিট বুকিং। বিভিন্ন এজেন্সি চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের পাসপোর্ট, ভিসা, ভ্রমণ নথিপত্র বা প্রবাসী শ্রমিকদের বৈদেশিক কর্ম পারমিট ছাড়াই শুধুমাত্র ই-মেইলের মাধ্যমে কয়েকটি এয়ারলাইন্সের বিভিন্ন রুটের গ্রুপ সিট ব্লক করে রাখে, যেগুলোর পিএনআর তৈরি করা হয় দুই থেকে তিন মাস আগেই। এজেন্সি বা যাত্রীদের পক্ষে ওই ফ্লাইটের টিকিট খালি আছে কি না তা জানার কোনো সুযোগ থাকে না। নামবিহীন গ্রুপ সিট বুকিংয়ের কারণে টিকিট মজুতদারি করা হয়। ফলে সিন্ডিকেট তৈরি হয়, আসন সংকট দেখা দেয়; ফলে টিকিট মূল্য ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের কার্যক্রমের ফলে যাত্রীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
জানা গেছে, মূলত মধ্যপ্রাচ্যগামী এয়ারলাইন্সগুলো অতিরিক্ত মুনাফার জন্যই এই পদ্ধতি অবলম্বন করে রিয়াদ, দাম্মাম, জেদ্দা, ওমান, দোহা, কুয়ালালামপুরসহ বিভিন্ন রুটের টিকিট সিট ব্লক করে রাখে। পরে তাদের পছন্দের ২০ থেকে ৩০টি এজেন্সির মাধ্যমে বাজারে টিকিট বিক্রয় করে।
আটাব সভাপতি আবদুস সালাম আরেফ জানিয়েছেন, এসব পরিস্থিতিতে যাত্রীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হচ্ছে এবং টিকিটের উচ্চমূল্যের কারণে ট্রাভেল এজেন্সিকে দায়ী করা হচ্ছে। এই সমস্যা নিয়ে আটাব চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলন করে সার্বিক অবস্থা গণমাধ্যমে তুলে ধরে এবং করণীয় বিষয়গুলো সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।
আটাব বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর একটি সংগঠন। ১৯৭৬ সাল থেকে আটাব বাংলাদেশের সব বৈধ ও সরকার নিবন্ধিত প্রায় চার হাজার ট্রাভেল এজেন্ট সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর সার্বিক কল্যাণে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশের এভিয়েশন ও পর্যটন খাতের সুষ্ঠু উন্নয়নের জন্য সরকারের গৃহীত সব কার্যক্রম বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সাথে আটাব অংশীজন হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
নাম, পাসপোর্ট নাম্বার, ভিসা, ম্যানপাওয়ার ক্লিয়ারেন্স ব্যতীত কোনো বুকিং করা যাবে না। সিট ব্লকের মাধ্যমে ফ্লাইটের ইনভেন্টরি ব্লক হয়ে যায়, যে কারণে মূল্য বাড়তে থাকে। এছাড়া কোনো ট্রাভেল এজেন্সির কাছে প্রকৃত চাহিদা না থাকলেও এয়ারলাইন্সের কাছে দুই লাইনের একটি ইমেইল করে কৃত্রিম ডিমান্ডের তৈরি করে। কৃত্রিম ডিমান্ডের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে এয়ারলাইন্সের এই পলিসির কারণে। ট্রাভেল এজেন্সিরা তার কাছে ডিমান্ড না থাকা সত্ত্বেও পণ্য মজুদ করার মতো এয়ার টিকেট মজুত করছে। এটা বন্ধ করতে হবে এবং বর্তমানে ৬০ হাজারেরও অধিক সিট এয়ারলাইন্সগুলো ব্লক করে রেখেছে। এই সিটগুলো এখনই ওপেন করে দিলে উদ্ভূত সংকট দূর হয়ে যাবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালযয়ের ১০টি নির্দেশনা হলো- শিগগির গ্রুপ-টিকিট বুকিংসহ যেকোনো প্রকার টিকিট বুকিংয়ের সময় ভ্রমণেচ্ছু যাত্রীর নাম, পাসপোর্ট নম্বর ও পাসপোর্টের ফটোকপিসহ বুকিং সম্পন্ন করতে হবে। বুকিং দেওয়ার তিন দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট যাত্রীর নামে টিকিট ইস্যু না হলে ওই তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টা উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এয়ারলাইন্স স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই টিকিট বাতিল করবে।
এই পরিপত্র জারির তারিখ পর্যন্ত এয়ারলাইন্স/ট্রাভেল এজেন্সিকে গ্রুপ-বুকিংয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ব্লক করা টিকিট আগামী সাত দিনের মধ্যে ভ্রমণেচ্ছু যাত্রীর নাম, পাসপোর্ট নম্বর এবং পাসপোর্টের কপিসহ বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স এমন টিকিট স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বাতিল করবে।
এয়ারলাইন্স এবং ট্রাভেল এজেন্সিগুলো আবশ্যিকভাবে বেসামরিক বিমান চলাচল বিধিমালা, ১৯৮৪-এর বিধি ২৮৯-এ বর্ণিত বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী যথাযথভাবে ট্যারিফ ফিলিংয়ের নিয়ম মানবে এবং বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) অনুমোদিত ট্যারিফ বেবিচকের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে।
এয়ারলাইন্স কিংবা ট্রাভেল এজেন্সি সংশ্লিষ্ট বিমানসংস্থার বেবিচক বরাবর দাখিল করা ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়ায় টিকিট বিক্রি করা থেকে বিরত থাকবে। একই সঙ্গে ট্রাভেল এজেন্সি বাধ্যতামূলকভাবে যাত্রীকে এয়ারলাইন্স থেকে প্রাপ্ত মূল্য সংবলিত টিকিট প্রদান এবং ওই টিকিট বিক্রির রসিদ দেবে।চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও কিংবা চাহিদার অতিরিক্ত টিকিট মজুত করে অন্য এজেন্টের মাধ্যমে এয়ার টিকিট বিক্রির কারণে টিকিটের দাম বাড়লে বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি-১৫ অনুযায়ী মূল ট্রাভেল এজেন্সির নিবন্ধন সনদ স্থগিত বা বাতিল করা হবে।
**বিমান টিকিট বুকিংয়ে পাসপোর্ট কপি লাগবে
**বাংলাদেশ বিমান ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ টাস্কফোর্সের