যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তার প্রভাবে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী যাওয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ ৬৯ হাজার বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের জন্য দেশ ছেড়েছেন, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) জানায়, টানা দুই বছর ধরে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমার প্রবণতা চলছে এবং চলতি অর্থবছরেও এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক অর্থনীতির চাপ সামাল দিতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরীফুল হাসান জানান, মার্চ মাস থেকে বিদেশগামী কর্মীর প্রবাহ কমতে শুরু করেছে, যার প্রধান কারণ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বিভিন্ন গন্তব্যে বিমান চলাচলে বিঘ্ন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ মানুষ বিদেশে কাজে গেলেও বর্তমানে সেই ধারায় ভাটা পড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত গত এক দশকে ৮৬ লাখের বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন, যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১২ লাখ কর্মী বিদেশে গিয়ে সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে।
শরীফুল হাসান বলেন, গত চার দশক ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের বাজার এবং রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। কিন্তু যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তায় সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রধান গন্তব্যগুলোতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার ভাষ্য, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ৬০ থেকে ৭০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করছেন। তাদের বড় একটি অংশের স্থায়ী চাকরি নেই। তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ কাতার ও দুবাইয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ধাক্কা দিয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক শ্রমিক দেশে ফিরতে শুরু করেছেন। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে। তিনি আরও বলেন, বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি করা না গেলে রেমিট্যান্সেও এর প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে রেমিট্যান্স আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো তা ৩০০ কোটি ডলারের নিচেই রয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, এখন কার্যত সৌদি আরবই একমাত্র বড় বাজার, যেখান থেকে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, অন্য প্রায় সব গন্তব্যই এখন কার্যত বন্ধ। তবে সুখবর হলো, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলতে যাচ্ছে। সেটি হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
রিক্রুটিং এজেন্সি সাদিয়া ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরের ফলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সুযোগ তৈরি হয়েছে। তার মতে, দেশটিতে ২ থেকে ৩ লাখ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকেই কর্মী নিয়োগ শুরু হতে পারে। বায়রার সাবেক এই মহাসচিব আরও বলেন, পূর্ব ইউরোপেও বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা রয়েছে। তবে ভিসা পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তার মতে, বর্তমানে ভিসা পেতে প্রায় পাঁচ মাস পর্যন্ত সময় লাগছে, যা কমাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন; ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে আরও বেশি মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত শ্রমবাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে পূর্ব ইউরোপ, দূরপ্রাচ্য ও নিউজিল্যান্ডসহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে কাজের অভাব নেই—মূল চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা; এজন্য প্রশিক্ষণব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়াতে উন্নত ল্যাব স্থাপন জরুরি।
