বাংলা কিউআরে ‘অবৈধ ক্যাশ আউট’

এক তরুণ কোনো পণ্য বা সেবা না কিনেও মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) অ্যাপ দিয়ে বাংলা কিউআর স্ক্যান করে ১০ হাজার টাকা ‘পেমেন্ট’ করেন। এরপর দোকানি তাঁকে সমপরিমাণ নগদ টাকা বুঝিয়ে দেন। বাইরে থেকে এটি সাধারণ মার্চেন্ট পেমেন্ট মনে হলেও বাস্তবে এটি ছিল ক্যাশ আউটের বিকল্প পদ্ধতি। আরও আশ্চর্যের বিষয়, বাংলা কিউআর পেমেন্টে গ্রাহকের কোনো খরচ না থাকলেও ওই তরুণের কাছ থেকে ক্যাশ আউটের নির্ধারিত চার্জ নেওয়া হয়।

রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট বাজারসংলগ্ন একটি দোকানে সম্প্রতি এমন ঘটনা ঘটে। ক্যাশ আউট করতে আসা এক তরুণকে প্রচলিত নিয়মে এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা না তুলে একটি ব্যাংকের দেওয়া বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা পাঠাতে বলেন দোকানি। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী, তরুণটি এমএফএস অ্যাপ দিয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা পাঠান। লেনদেন শেষে নগদ টাকা পেলেও এটি ক্যাশ আউট নাকি পেমেন্ট—তা তিনি জানতেন না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এভাবেই বাংলা কিউআর ব্যবহার করে গড়ে উঠছে অবৈধ ক্যাশ আউটের কারবার। কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেই মার্চেন্টরা পেমেন্ট গ্রহণ করছেন এবং একই সঙ্গে গ্রাহকের কাছ থেকে ক্যাশ আউটের নির্ধারিত চার্জ আদায় করছেন। ফলে ডিজিটাল পেমেন্টের জন্য তৈরি অবকাঠামোই ব্যবহৃত হচ্ছে নগদ টাকা দেওয়ার বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে।

যেভাবে চলছে কারবার

ধরা যাক, একজন গ্রাহকের ১০ হাজার টাকা ক্যাশ আউট প্রয়োজন। প্রচলিত নিয়মে তাঁকে এমএফএস এজেন্টের কাছে গিয়ে টাকা উত্তোলন করতে হয় এবং এর জন্য নির্ধারিত চার্জ দিতে হয়। তবে বাংলা কিউআরনির্ভর পদ্ধতিতে গ্রাহক দোকানে গিয়ে ক্যাশ আউটের কথা জানালে দোকানি তাঁকে নিজের মার্চেন্ট কিউআর কোড দেন। গ্রাহক এমএফএস অ্যাপ দিয়ে ওই কিউআর কোড স্ক্যান করে ১০ হাজার টাকা পাঠান। এরপর দোকানি তাঁকে ১০ হাজার টাকা নগদ বুঝিয়ে দেন। এ ক্ষেত্রে কোনো পণ্য বা সেবা কেনাবেচা না হলেও লেনদেনটি মার্চেন্ট পেমেন্ট হিসেবে সম্পন্ন হয়। এরপরও অনেক ক্ষেত্রে দোকানি গ্রাহকের কাছ থেকে ক্যাশ আউটের নির্ধারিত চার্জ আদায় করেন। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে এটি মার্চেন্ট পেমেন্ট হলেও বাস্তবে তা ব্যবহৃত হচ্ছে নগদ টাকা উত্তোলনের বিকল্প হিসেবে।

তিন দিক থেকে অনিয়ম

সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন লেনদেনে অন্তত তিন ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। প্রথমত, পণ্য বা সেবা বিক্রি না করেই মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টে পেমেন্ট গ্রহণ করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মার্চেন্ট পেমেন্টে গ্রাহকের কাছ থেকে ক্যাশ আউট চার্জ নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও তা আদায় করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, ক্যাশ আউটের পরিবর্তে মার্চেন্ট পেমেন্ট দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট লেনদেনে প্রযোজ্য রাজস্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের লেনদেন নিয়মিত ও বড় পরিমাণে হলে তা সন্দেহজনক লেনদেনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে গ্রাহক যদি জানতেই না পারেন যে তাঁর লেনদেনটি কী ধরনের, তাহলে পরবর্তী সময়ে ওই অর্থের উৎস ও ব্যবহার নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থ পাচারের ঝুঁকি

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো পণ্য বা সেবা না কিনে মার্চেন্ট কিউআর ব্যবহার করে টাকা পাঠানো হলে লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আর সেই অর্থ যদি অবৈধ উৎস থেকে আসে কিংবা কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলো মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার প্রতিরোধ কাঠামোর নজরদারিতে আসতে পারে। এর ফলে শুধু মার্চেন্ট বা এজেন্ট নয়, লেনদেনে জড়িত অন্যান্য পক্ষও আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর এজেন্ট বা মার্চেন্ট হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক অনুমোদন নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে। আরও বড় ঝুঁকি হলো, এসব হিসাব ব্যবহার করে জুয়া, হুন্ডি, অনলাইন প্রতারণা কিংবা অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অর্থ স্থানান্তর করা হতে পারে।

নজরদারিতে অস্বাভাবিক লেনদেন

বাংলাদেশ ব্যাংক গত ১০ আগস্ট জারি করা এক নির্দেশনায় মার্চেন্টদের অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়ে সতর্ক করেছে। এতে কোনো মার্চেন্টের অস্বাভাবিকসংখ্যক বা অস্বাভাবিক ধরনের লেনদেন দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে তা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ, যাচাই ও পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃত্রিমভাবে লেনদেন বিভাজন, ক্যাশ আউটসহ যেকোনো ধরনের অপব্যবহার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলা কিউআর নিয়ে সম্প্রতি নানা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তবে লেনদেনের পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট সব তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রয়েছে। কেউ এর অপব্যবহার করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বাংলা কিউআরের মূল উদ্দেশ্য ডিজিটাল ও নগদবিহীন লেনদেনকে উৎসাহিত করা। এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করে কেউ অবৈধ লেনদেনে জড়ালে তা নজরদারির বাইরে থাকবে না।

এজেন্ট-মার্চেন্ট একই দোকানে কেন

সংশ্লিষ্ট এমএফএস কর্মকর্তারা জানান, এজেন্ট ও মার্চেন্টের ব্যবসায়িক কার্যক্রম আলাদা। এজেন্ট নগদ টাকা জমা ও উত্তোলনের মতো সেবা দেন, আর মার্চেন্ট পণ্য বা সেবার বিপরীতে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করেন। ফলে একই দোকানে দুই ধরনের হিসাব থাকলে সেগুলোর অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে একই দোকানে এজেন্ট ও মার্চেন্ট হিসাব দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। কিন্তু বাংলা কিউআর চালুর পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক এজেন্ট পয়েন্টে মার্চেন্ট কিউআর স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এজেন্ট পয়েন্টের ব্যবসায়িক ধরন বিবেচনা না করে কিউআর স্থাপন করা হলে তা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

বিপদে পড়তে পারেন সাধারণ গ্রাহকও

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সাধারণ গ্রাহকের জন্য। কারণ, অনেক গ্রাহক বাংলা কিউআর ও ক্যাশ আউটের পার্থক্য না বুঝেই দোকানির কথামতো লেনদেন করছেন। তাঁদের কাছে এটি শুধু টাকা পাঠিয়ে নগদ টাকা পাওয়ার একটি সহজ পদ্ধতি। কিন্তু লেনদেনের রেকর্ডে সেটি ক্যাশ আউট হিসেবে নয়, মার্চেন্ট পেমেন্ট হিসেবেই দেখা যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে ওই লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে গ্রাহককে ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে—কেন কোনো পণ্য বা সেবা না কিনেও তিনি ওই মার্চেন্টকে টাকা দিয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমএফএস সেবা পৌঁছে দিতে এজেন্ট নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বা সীমিত সুবিধা পাওয়া লাখ লাখ মানুষ এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টাকা জমা, উত্তোলন ও স্থানান্তরের সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে বাংলা কিউআর ব্যবহার করে অবৈধ ক্যাশ আউটের প্রবণতা বাড়লে শুধু সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট বা এজেন্ট নয়, পুরো এমএফএস খাতই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে অপব্যবহারের অভিযোগে এজেন্ট হিসাব বন্ধের ঘটনা বাড়লে প্রান্তিক মানুষের আর্থিক সেবাপ্রাপ্তিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলা কিউআর বন্ধ করা নয়, বরং এর অপব্যবহার ঠেকানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য এজেন্ট পয়েন্টে কিউআর স্থাপনের আগে ব্যবসার ধরন যাচাই, অস্বাভাবিক লেনদেনে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি এবং পণ্য বা সেবা ছাড়াই পেমেন্ট গ্রহণের প্রবণতা শনাক্তে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে নগদবিহীন লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগটি অবৈধ ক্যাশ আউটের নতুন মাধ্যম হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।