স্টারলিংক যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ

স্টারলিংক যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী ৯ এপ্রিল দেশে পরীক্ষামূলক চালু হবে এই পরিষেবা। পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হবে। এটি ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, স্টারলিংক সেবা সঠিকভাবে চালানো সম্ভব হলে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।প্রাথমিকভাবে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বড় কোম্পানি এবং ই-কমার্স ও ডিজিটাল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো স্টারলিংকের গ্রাহক হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে এই নতুন প্রযুক্তি দেশের ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে স্থানীয় ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, তারা তেমন কোনো চাপ অনুভব করছেন না। যদিও কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে দেশীয় আইএসপি।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংকের এই ইন্টারনেট সেবা চালু করতে প্রস্তুত বাংলাদেশ। বিটিআরসি ইতোমধ্যে গাইডলাইন তৈরির কাজ শেষ করেছে। স্টারলিংক চালু করা এখন সময়ের ব্যাপার। টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্টারলিংক শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতাই বদলাবে না, বরং অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কৃষিসহ নানা খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিশেষত, এটি সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনতে পারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে ফাইবার অপটিক পৌঁছানো কঠিন। স্টারলিংকের মাধ্যমে সরাসরি স্যাটেলাইট থেকে ইন্টারনেট সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, স্টারলিংক বাজারে এলে বর্তমানে ইন্টারনেট নিয়ে দেশে যে মনোপলি ব্যবসা ও হয়রানি চলছে তা ভেঙে যাবে। দাম কিছুটা বাড়লেও গ্রাহকরা দ্রুত গতির ইন্টারনেট সেবা পাবেন। একই সঙ্গে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল তথা দুর্গম এলাকায় পৌঁছে যাবে ইন্টারনেট সেবা। স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবায় গ্রাহকরা অনলাইন বাফারিং, গেমিং এবং ভিডিও কলিংয়ের মান ভালো পাবেন।স্টারলিংক একটি স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা, যা লো আর্থ অরবিট স্যাটেলাইট ব্যবহার করে দ্রুতগতির ইন্টারনেট প্রদান করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্থানীয় আইএসপি (ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী) প্রতিষ্ঠানগুলো অপটিক ফাইবার ও মোবাইল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে। ফলে শহরাঞ্চলে ব্রডব্যান্ড সংযোগ ভালো থাকলেও গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা এখনো একটি চ্যালেঞ্জ।

জানা গেছে, স্টারলিংক ছোট উপগ্রহের একটি অ্যারের মাধ্যমে সীমাহীন উচ্চগতির ডেটা অফার করে যা প্রতি সেকেন্ডে ১৫০ মেগাবিট (এমবিপিএস) ইন্টারনেট গতি সরবরাহ করে। স্পেসএক্স আগামীতে এই হার দ্বিগুণ করারও পরিকল্পনা নিয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ইন্টারনেটের সর্বোচ্চ গতি ২৫ এমবিপিএসের মতো। বিশ্বের দ্রুতগতির ইন্টারনেট প্রদানকারী ১০৮টি দেশের মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ৯০তম।স্টারলিংক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯১ এমবিপিএস, কানাডায় ৯৭ এমবিপিএস, অস্ট্রেলিয়ায় ১২৪ এমবিপিএস গতিতে ক্লক ইন করেছে। মেক্সিকোতে স্টারলিংক ছিল উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে দ্রুততম স্যাটেলাইট ইন্টারনেট, যার গড় ডাউনলোড গতি ১০৫.৯১ এমবিপিএস।

টেলিকম বিশেষজ্ঞ ও এশিয়া প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টারের (এপনিক) এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল সদস্য এবং ইন্টারনেট প্রকৌশলী সুমন আহমেদ সাবির বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক সংযোজন। এর মাধ্যমে অনেক ধরনের পরিষেবা পাওয়া যাবে এবং সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে দুর্গম এবং প্রত্যন্ত এলাকায় ইন্টারনেট সেবা পৌঁছানো। এতে দেশের ইন্টারনেট সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভালো প্রতিযোগিতাও তৈরি হবে।

বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, স্টারলিংক চালুর উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। এর মাধ্যমে ইন্টারনেট পরিষেবার বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা একটি ভালো দিক।

স্টারলিংক ইন্টারনেট যেভাবে কাজ করে : স্টারলিংক যেহেতু স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা দেয় তাই এর সিগন্যাল রিসিভ করতে অ্যান্টেনার প্রয়োজন হবে। এ ধরনের অ্যান্টেনা অনেকটা ডিশের ছাতার মতো। তবে আকারে ছোট। ১ ফুট ছাতা দিয়ে স্টারলিংকের ইন্টারনেট সিগন্যাল যে কোনো প্রান্তে বসেই পাওয়া যাবে। এর জন্য লোয়ার অরবিট স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হয়। তবে অনেক নিম্ন অরবিটাল স্যাটেলাইটের কারণে লেটেন্সি রেট কিছুটা কম হবে। লেটেন্সি রেট এক পয়েন্ট থেকে অন্য পয়েন্টে ডেটা স্থানান্তর করতে যে সময় লাগে তাকে নিম্ন অরবিটাল স্যাটেলাইট বোঝায়। কম বিলম্বের কারণে এগুলোর অনলাইন বাফারিং, গেমিং এবং ভিডিও কলিংয়ের মান ভালো হয়ে থাকে। তবে স্টারলিংকের ইন্টারনেট পেতে আপনাকে ডিশ ছাড়াও সিগন্যাল ডিকোডার অর্থাৎ রিসিভার লাগবে। এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট যে কোনো জায়গা থেকে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর গতি সাধারণত প্রতিশ্রুতির তুলনায় অনেক দ্রুত হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং দুর্যোগে স্টারলিংক ইন্টারনেট ভালো পরিষেবা দেবে। তার না থাকার কারণে দুর্যোগের সময় এটি সহজেই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্টারলিংক চালু হলে করপোরেট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাকআপ হিসাবে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবার সঙ্গে সংযুক্ত হবে। সব মিলিয়ে লোকাল আইএসপিগুলোর ওপর খুব একটা প্রভাব পড়বে না। এখন বাজারে ছোট-বড় মিলিয়ে তিন হাজারের মতো প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার হিসাবে কাজ করছে, যারা মূলত হোম ইউজারদেরই বেশি সেবা দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, স্টারলিংক, যেহেতু একটি প্রিমিয়াম সেবা, তা শহরাঞ্চলে অনেকের জন্য কিছুটা ব্যয়বহুল হতে পারে। একটি স্থানীয় আইএসপি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, দেশজুড়ে আমাদের একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু রয়েছে। এখন আমরা ফাইবার নেটওয়ার্কের উন্নতিতেই বেশি জোর দিচ্ছি। আমরা গ্রাহকদের জন্য স্বল্প খরচে মানসম্মত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। যদিও স্টারলিংক প্রযুক্তিগত দিক থেকে নতুন ও খরচ অনেক বেশি। আমরা স্টারলিংক নিয়ে শঙ্কিত নই, তবে আমাদেরও সেবা উন্নত করতে হবে।

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি ইমদাদুল হক বলেন, স্টারলিংক চালু হলে দেশীয় আইএসপিগুলো কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, তবে প্রতিযোগিতা বাড়বে। তার মতে, শহরাঞ্চলে স্টারলিংকের সেবা অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল না; বরং পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত এলাকায়, যেখানে ব্রডব্যান্ড পৌঁছানো কঠিন, সেসব জায়গায় স্টারলিংক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত। সরকার যেহেতু নতুন প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, তাই এটিকে প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবেই দেখছেন তারা। সবমিলে দেশীয় আইএসপিগুলোর ওপর এর কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!