দেশের প্রথম ইন্টার অপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন প্ল্যাটফর্ম ‘বিনিময়’ এখন বন্ধ হওয়ার পথে। ভারতের ইউপিআই আদলে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মটির মূল উদ্যোক্তা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজিব ওয়াজেদ জয়। কিছুদিনের মধ্যে কারিগরি ত্রুটির কারণে এটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটি আর পরিচালনা করতে চাচ্ছে না, তাই চুক্তি বাতিলের আইনি জটিলতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সূত্র বলছে,বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিময় প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সজিব ওয়াজেদ জয়ের শেল কোম্পানির দায় টানতে চায় না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য আইনি জটিলতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, এবং আইনজীবীর কাছ থেকে আইনি পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। যদি কোনো আইনি বাধা না থাকে, তবে চুক্তি দ্রুত বাতিল হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিনিময়ের সঙ্গে চুক্তিতে থাকতে চায় না বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে একই মুহূর্তে চুক্তি বাতিল হবে তা বলা যাবে না। আমরা আইনি জটিলতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছি। বর্তমানে অ্যাপটি কার্যকর নয় বলেও জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
এদিকে গত ২৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, মোবাইলে আর্থিক সেবার (এমএফএস) আন্তঃলেনদেন পরিচালনার জন্য ‘বিনিময়’ নামে যে প্ল্যাটফর্ম করা হয়েছিল, সেটি ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের শেল কোম্পানি। এমএফএসে আন্তঃলেনদেন ব্যবস্থা এগোতে না পারার একটি বড় কারণ, এটি আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) এর মাধ্যমে ব্যাংক ও মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তঃলেনদেন চালু করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। গ্রাহকের জন্য কোনো খরচ না হওয়া নিশ্চিত করা হয়েছিল। ২০২০ সালের অক্টোবরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছিল, সফল পাইলট টেস্টিং শেষে ২৭ অক্টোবর থেকে ইন্টার-অপারেবিলিটি বা পারস্পরিক (লাইভ) লেনদেন-সুবিধা চালু হবে।
তবে তখন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে এ সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ একটি প্রকল্প হাতে নেয়। এতে খরচ হয় প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন একাডেমি প্রতিষ্ঠাকরণ (আইডিয়া) প্রকল্প বিনিময় সেবা তৈরি করে। পরে বাংলাদেশ ব্যাংককে এটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়, যা পরে চালু করা হয়। তবে এতে লেনদেন তেমন হচ্ছে না। কারণ, সেবাগ্রহীতা সবাইকে পৃথকভাবে বিনিময়ে নিবন্ধন করতে হয়। পাশাপাশি এতে মাশুলও দিতে হয়। বিনিময় অ্যাপের কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ছেলে জারেফ হামিদ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র বলছে, বিনিময়ের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করলেও ইন্টার অপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশনের জন্য নতুন ফরমেটে নতুন চিন্তা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক; কিন্তু সেটি কী ফরমেটে হবে বা এনপিএসবির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে কি না, তা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইন্টার অপারেবল ট্রানজেকশনের জন্য নতুন অ্যাপ করবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তথ্য বলছে, সব ব্যাংক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) সহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লেনদেনে ইন্টার-অপারাবিলিটি নিশ্চিত করতে বিনিময় চালু করা হয়েছিল। গ্রাহকরা মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে রেজিস্ট্রেশন করে ভার্চুয়াল আইডি তৈরি করে সহজেই অর্থ লেনদেন করতেই এ অ্যাপটি তৈরি। এই অ্যাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।
ভারতের ইউপিআইয়ের আদলে গড়ে ওঠা প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে প্রাথমিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল ১১টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৮টি ব্যাংক ও ৩টি এমএফএস। মূলত চারটি প্রতিষ্ঠান এ প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ করে। প্রতিষ্ঠান চারটি হলো, ওরিয়ন ইনফরম্যাটিকস লিমিটেড, মাইক্রোসফট বাংলাদেশ লিমিটেড, ফিনটেক সল্যুশন লিমিটেড ও সেইন ভেঞ্চারার্স লিমিটেড (জেভি)। এর মধ্যে ওরিয়ন ইনফরম্যাটিকস লিমিটেড ও ফিনটেক সল্যুশন লিমিটেড রক্ষণাবেক্ষণ করার কথা।