** সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী বহু ব্যক্তির করফাঁকি, বিদেশে অর্থপাচারের বিষয় তদন্ত করছে
** ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্স একপার্ট নিয়োগে অর্থ উপদেষ্টা এনবিআরকে অনুমতি দিয়েছে
** এনবিআর বলছে, ট্যাক্স এক্সপার্ট নিয়োগ করা হলে সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হবে
বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। কখনো বাণিজ্যের আড়ালে, আবার কখনো সরাসরি অর্থপাচার হয়েছে। দেশের প্রভাবশালী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তি এবং স্বনামধন্য গ্রুপ এসব অর্থপাচার করেছে। পাচার হওয়া অর্থ থেকে রাজস্ব আদায়ে কাজ করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দুইটি বিশেষায়িত ইউনিট। যার মধ্যে রয়েছে—সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট। এই দুই ইউনিট কয়েকশত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের করফাঁকি এবং অর্থপাচারের তদন্ত করছে। করফাঁকি উদ্ঘাটন ও তা আদায়ে কর বিভাগের কর্মকর্তাদের যথেষ্ট প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ হতে ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব আদায়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্স এক্সপার্ট’ বা বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করার অনুরোধ জানিয়েছে এনবিআর। সেজন্য সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এনবিআর বলছে, আন্তর্জাতিক কর বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হলে সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হবে।
এনবিআর সদস্য (বোর্ড প্রশাসন) জিএম আবুল কালাম কায়কোবাদ সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, এনবিআর রাজস্ব আহরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। সংস্থাটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর আহরণ ও সকল প্রকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংগঠন। রাজস্ব আহরণের অংশ হিসেবে গোপনকৃত আয় ও কর ফাঁকি উদঘাটন এবং ফাঁকি দেয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধার করা আয়কর বিভাগের নিয়মিত কাজের একটি অংশ। আয়কর বিভাগের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে যথেষ্ট পরিমাণে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং এ কাজটি তারা সচরাচর সম্পন্ন করে থাকে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট— এ দুইটি ‘বিশেষায়িত ইউনিট’ মূলত আয় ও সম্পদ গোপনের কারণে সংঘটিত রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটনে কাজ করে ইতোমধ্যে বেশ সফলতা অর্জন করেছে।
আরও বলা হয়, এ দেশের মানুষ গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে, বিগত দেড় দশকের বেশি সময়ে এ দেশের সম্পদের একটি বিশাল অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিদেশে পাচারকৃত এ সকল সম্পদের উপর কর ধার্য্য করা এবং তা আদায় করার বিষয়ে আয়কর বিভাগের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট পরিমাণে সমৃদ্ধ নয়। বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ হতে ফাঁকি দেয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধারে সিআইসি এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট বিশেষভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একই ধরণের কাজে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্স এক্সপার্ট’ নিয়োগ করা হলে তা এই দুটি সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হবে। যেহেতু উভয় সংস্থায় কর্মরত কর্মকর্তারা বাংলাদেশি, সেহেতু জন্মসূত্রে বাংলাদেশি কোন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হলে তা বিশেষভাবে সহায়ক হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে মর্মে এনবিআর মনে করে। পাচারকৃত বিদেশে থাকা সম্পদ হতে রাজস্ব পুনরুদ্ধার বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্স এক্সপার্ট’ নিয়োগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইআরডি সচিবকে অনুরোধ করা হয়। বিষয়টিতে অর্থ উপদেষ্টার সানুগ্রহ অনুমতি প্রদান করেছেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনবিআর সূত্রমতে, সরকার বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ৭ শতাংশ ট্যাক্স প্রদান সাপেক্ষে বিদেশে থাকা অর্থ বা সম্পদ ফিরিয়ে আনতে ২০২২-২০২৩ অর্থবছর সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু ওই অর্থবছরের ৩০ জুন মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি নাগরিক এই সুযোগ নেননি। ওই সময় সরকার পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে আর্ন্তজাতিক আইনি পরামর্শদাতা সংস্থা নিয়োগের সিদ্ধান্ত হলেও পরে তা আর আলোর মুখ দেখেননি। তবে এর আগে ২০০৯ সালে বাংলাদেশের এক স্বনামধন্য ব্যক্তির পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে সরকার ‘অক্টোখান’ নামে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছিল। সে সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্থাটিকে উদ্ধারকৃত অর্থের ১০ শতাংশ কমিশন হিসেবে দেয়। পরবর্তীতে দুইবার চুক্তি নবায়ন করা হয়েছিল। তবে ২০১৫ সালের পর আর চুক্তি নবায়ন হয়নি। কিন্তু এনবিআরের পক্ষ থেকে বিদেশে পাচার করা অর্থে কর আদায়ে বহুবার চেষ্টা করা হলেও সরকার কোন উদ্যোগ নেয়নি।
অন্যদিকে, দেশের বৃহৎ দশটি ব্যবসায়ী গ্রুপ এবং গ্রুপ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের অধীনে যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করেছে এনবিআর। ইতোমধ্যে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফেরাতে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের অধীনে কাজ শুরু করেছে জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম (জেআইটি) বা যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল। যৌথ দলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), এনবিআরের সিআইসি এবং কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর কাজ করছে। দুদক ও সিআইডিও একইভাবে যৌথ দল গঠন করেছে। দশটি ব্যবসায়ী গ্রুপের মধ্যে রয়েছে—এস আলম, বেক্সিমকো, নাবিল, সামিট, ওরিয়ন, জেমকন, নাসা, বসুন্ধরা, সিকদার ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট গ্রুপ।
অপরদিকে, করফাঁকি ও মুদ্রা পাচারের অভিযোগে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক নির্বাচন কমিশন সচিব হেলাল উদ্দিন আহমেদসহ আলোচিত ছয়জনের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে সিআইসি। তালিকার অন্যরা হলেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার (এস কে) সুর চৌধুরী এবং সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপা। তথ্য পাওয়ার পর তাদের করফাঁকি ও অর্থপাচারের বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। এছাড়া আরো শতাধিক ব্যক্তির করফাঁকি ও অর্থপাচারের বিষয় তদন্ত করছে সিআইসি।
অন্যদিকে, আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট দেশের প্রভাবশালী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ২২ জনের করফাঁকি ও অর্থপাচারের তদন্ত করছে। তালিয়ে রয়েছে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শামীম ওসমান, নাজমুল হাসান পাপন। এছাড়া আরো রয়েছে সেলিম ওসমান, সিরাজগঞ্জের এমপি শফিকুল ইসলাম পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক সুধাংশু শেখর ভদ্র, পরিবহন শ্রমিক নেতা মশিউর রহমান রাঙ্গা, পরিবহন নেতা ও এনা পরিবহনের মালিক কাজী এনায়েত উল্লাহ, দুদকের দুই প্রসিকিউটর খুরশীদ আলম ও মোশারফ হোসেন কাজল এবং ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি লিয়াকত শিকদার। তালিকায় রয়েছে—সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী জান্নাত আরা হেনরী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশিকুর রহমান ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মঈন উদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান, প্রভাবশালী সাংবাদিক শ্যামল দত্ত ও মনজুরুল আহসান বুলবুল।
এছাড়া রাতের ভোটের কারিগর ডিসি, এসপিসহ ছয় শতাধিক ব্যক্তি ও কোম্পানির বিরুদ্ধে কর ফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করছে আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট। তালিকায় বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, খেলোয়াড়, সংসদ সদস্য, এনবিআরের আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পেশার বিতর্কিত ব্যক্তিরা রয়েছেন। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের শুধু দেশে করফাঁকি নয়, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের বিষয়েও বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে এই ইউনিট। ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে জ্বালানি ও চিকিৎসা খাতের অন্যতম ইউনাইটেড গ্রুপ। এরই মধ্যে এই গ্রুপের একটি কোম্পানির কর ফাঁকির কিছু টাকা আদায়ও করেছেন গোয়েন্দারা। তারকাদের মধ্যে সাকিব আল হাসান, নিপুনসহ অনেকেই আছেন তদন্তের আওতায়। এরই মধ্যে সাকিবের মায়ের নথিতে সন্দেহজনক সম্পদ পেয়েছেন গোয়েন্দারা।
** করফাঁকির তদন্ত: সাত কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর স্থগিত
** অর্থপাচার ও ব্যাংক ধ্বংস: রক্ষকরা ভক্ষক
** রাতের ভোটের ১১৬ ডিসি-এসপি কর গোয়েন্দার জালে
** ইউসিবির সাবেক পরিচালকের অর্থপাচারের অভিযোগ
** ১৩ প্রতিষ্ঠানের পাচার ৪১৮ কোটি টাকা
** এস আলম : ২ এলসিতেই পাচার ১০ হাজার কোটি টাকা