পদ্মা সেতুতে প্রতি বছর যান চলাচল বাড়ার ফলে টোল আদায়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এই আয় উল্লেখযোগ্যভাবে জমা থাকছে না। রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটানোর পর টোলের বড় অংশ সেতু নির্মাণে নেওয়া ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। উদ্বোধনের পর থেকে আদায়কৃত টোলের প্রায় ৭২ শতাংশই ঋণ শোধে ব্যবহার করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ), সংস্থাটির সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী।
এতে দেখা যায়, উদ্বোধনের পর গত ৪ বছরে পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার হয়েছে ২ কোটি ৬৭ লাখ ৭৫ হাজার ৫২৯টি। এতে মোট টোল আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৪৭৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সেতুর রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে ৬০৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বা ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ অর্থ। আর সেতুটি নির্মাণে গৃহীত ঋণ থেকে সুদাসল পরিশোধ করা হয়েছে ২ হাজার ৫১৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বা ৭২ দশমিক ৪১ শতাংশ অর্থ। সব ব্যয় বাদ দিয়ে উদ্বৃত্ত ছিল ৩৫৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা বা ১০ দশমিক ২০ শতাংশ অর্থ।
বিবিএর তথ্য মতে, পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ঋণ দেয় ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ১ শতাংশ সুদে ৩৪ বছরে মোট ১৪০ কিস্তিতে এ ঋণ শোধ করতে হবে। এতে গত ৪ বছরে বিবিএকে ঋণের বিপরীতে সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ১ হাজার ১৭০ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এছাড়া ঋণের আসল পরিশোধ করতে হয়েছে ১ হাজার ৩৪৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয় ২০২২ সালের ২৫ জুন। পরের দিন (২৬ জুন) সেতুটি সর্বসাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। যদিও নানা বিশৃঙ্খলার কারণে ২৭ জুন থেকে সেতুটিতে বাইক পারাপার বন্ধ করা হয়। এতে শুরুর দিকে সেতুটি যানবাহন পারাপারের সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পায়। উদ্বোধনের পর ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৫ দিনে পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার হয় ১ লাখ ২১ হাজার ৮৯৫টি। এতে ১০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা টোল আদায় হয়। ওই ৫ দিনে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ছিল ১২ লাখ টাকা।
পরের অর্থবছর সেতুটি দিয়ে যানবাহন পারাপারের সংখ্যা ছিল ৫৭ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৩টি। ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল আবারও সেতুটিতে বাইক পারাপারের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর আবার গাড়ি চলাচলের সংখ্যা বাড়ে। ২০২২-২৩ অর্থবছর সেতুটি থেকে টোল আদায় হয় ৮২০ কোটি ৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয় ৮১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করা হয় যথাক্রমে ২৯৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা ও ৩৩৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। সব ব্যয় শেষে ওই অর্থবছর বিবিএর উদ্বৃত্ত ছিল ১০৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
বাইক চলাচলের অনুমতির পর পদ্মা সেতুতে যানবাহন পারাপার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেতু দিয়ে মোট ৬৭ লাখ ৫৪ হাজার ৮৩০টি যানবাহন চলাচল করে, যার মাধ্যমে টোল আদায় হয় ৮৫৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয় ১৪৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এছাড়া ঋণের সুদ বাবদ ২৯৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা এবং আসল পরিশোধে ৩ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। সব ব্যয় শেষে উদ্বৃত্ত থাকে ৭৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকলেও পদ্মা সেতুতে যান চলাচল সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি পায়। যদিও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যানবাহন পারাপার কমে গিয়েছিল, পরবর্তী মাসগুলোতে তা আবার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। ফলে ওই অর্থবছরে মোট যান চলাচল দাঁড়ায় ৬৯ লাখ ৬৮ হাজার ৪৫টি এবং টোল আদায় বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৮৭৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
রাজনৈতিক অস্থিরতায় আয় ব্যাপক হ্রাস পাওয়ায় ওই অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পদ্মা সেতুর ঋণ পরিশোধও বিঘ্নিত হয়। তবে আয় বাড়ায় পরে তা পরিশোধ করে দেয় বিবিএ। ২০২৪-২৫ অর্থবছর পদ্মা সেতুর ঋণের সুদ পরিশোধ করা হয় ২৯১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ও আসল পরিশোধ করা হয় ৩৩৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ব্যয় শেষে টোল থেকে উদ্বৃত্ত ছিল ৭১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এদিকে সদ্যবিদায়ী অর্থবছর (সাময়িক হিসাবে) পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৭১ লাখ ৮৮ হাজার ২৮৬টি। এতে টোল আদায় বেড়ে দাঁড়ায় ৯১২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ছিল ১৯৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। আর সুদ ও আসল পরিশোধ করা হয়েছে যথাক্রমে ২৮৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ও ৩৩৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এতে সব ব্যয় শেষে উদ্বৃত্ত ছিল ৯১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
বিবিএর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি বছর পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার বাড়ছে। এতে টোল আদায় স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। তবে যানবাহন পারাপারা বাড়ায় সেতুর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে সুদ ও আসল পরিশোধ শেষে খুব একটা উদ্বৃত্ত থাকছে না। এছাড়া প্রতি ৫ বছর পর পর পদ্মা সেতুর বড় ধরনের মেইনটেইন্সের কাজ পরিচালনা করতে হবে। এতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হবে। ওই বছরগুলোতে সেতু কর্তৃপক্ষকে ঘাটতিতে পড়তে হবে।
