আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি, তবে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির মাঠে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে দেশে অন্তত ১১টি নতুন রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করেছে। এছাড়া, জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে দুটি নতুন দল শিগগিরই ঘোষণা হতে পারে। এসব নতুন দল ভোটের মাঠে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
এ ছাড়া জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামী দলগুলো নিয়ে একটি জোট এবং সিপিবি-বাসদ-জাসদের নেতৃত্বে বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে আরকেটি জোট করার জন্যও চলছে তোড়জোড়। রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রত্যেক নির্বাচন সামনে রেখে কিছু রাজনৈতিক দল মাঠে আসে। নানা উদ্দেশ্য নিয়েই এসব দল গঠন করা হয়। ভোট শেষে কেউ টিকে থাকে, তবে অধিকাংশই হারিয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তোপের মুখে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালানোর পর রাজনীতিতে আসে নতুন ধারা। আগস্টের পর থেকে নতুন নতুন রাজনৈতিক দল আসতে শুরু করে রাজনীতির মাঠে। এখন পর্যন্ত অন্তত ১১টি রাজনৈতিক দল রাজনীতির মাঠে আত্মপ্রকাশ করলেও কেউ তেমন সাড়া তুলতে পারেনি। কারণ এসব দলে নেই পরিচিত কোনো রাজনৈতিক মুখ কিংবা জনপ্রিয় কোনো পেশাজীবী। জাতীয় প্রেসক্লাব কিংবা অন্য কোনো স্থানে সংবাদ সম্মেলন করে দলের আত্মপ্রকাশ করেই সীমাবদ্ধ অনেকে দলের কার্যক্রম। তবে দু-একটি দলকে মাঝে বিভিন্ন জনইস্যু নিয়ে কর্মসূচি দিতে দেখা গেছে।
রাজনীতির মাঠে যে ১১ নতুন দল
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আত্মপ্রকাশ করেছে নতুন রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি’। নতুন সমাজসমৃদ্ধ দেশ, হোক জনগণের বাংলাদেশ’ স্লোগানে চেয়ারম্যান হিসেবে প্রকৌশলী ড. বিভূতি রায় আর মহাসচিব হিসেবে প্রকৌশলী মাহবুব সুমন দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ড. বিভূতি রায় বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে এমন একটি জাতিতে রূপান্তর করা, যেখানে প্রতিটি ব্যক্তির উন্নতি, অংশগ্রহণ এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ থাকবে। এ সময় তিনি দলের ১০টি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তুলে ধরেন।
এর আগে গত ২৮ জানুয়ারি মেজর জেনারেল (অব.) মো. এহতেশাম উল হকের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে আরেকটি রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শক্তি’। নির্বাচন বা ক্ষমতার জন্য নয়, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায়, রাষ্ট্র বিনির্মাণে ও দেশ পুনর্গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালনের প্রত্যয় নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে দলটি।
মানবাধিকারকর্মী মো. নুর হাকিমকে চেয়ারম্যান এবং ইদ্রিস আলী নান্টুকে সাধারণ সম্পাদক করে গত ৪ জানুয়ারি ১০৫ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে আরেকটি রাজনৈতিক দল ‘দেশ জনতা পার্টি’। পার্টির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট ইকবাল কবির। দলের ঘোষণাপত্র পাঠ করার সময় চেয়ারম্যান নুর হাকিম বলেন, দলটির লক্ষ্য একটি সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত, ন্যায়সংগত, দারিদ্র্যমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, উদার গণতান্ত্রিক এবং বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
মো. সিরাজুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয় নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি-(বিপিপি)’। দলটির আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি সর্বদাই জনগণের মতামতকে সবার সামনে উপস্থাপন করে জনগণের মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য উপযুক্ত কর্মসূচি ঘোষণা করবে।
গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, উন্নয়ন ও শন্তি স্লোগান সামনে রেখে গত বছরের ৩০ নভেম্বর আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি (বিজিপি) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল। গোপালগঞ্জের চাপাইলের মধুমতি পার্কের সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন সংগঠনের আত্মপ্রকাশের বিষয় অবহিত করেন দলটির আহ্বায়ক ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ, ইনু) গোপালগঞ্জ জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রশিদ চৌধুরী।
রাজধানীর উত্তরায় সংবাদ সম্মেলন করে গত ১৬ নভেম্বর আত্মপ্রকাশ করে রাজনৈতিক দল ‘মুক্তির ডাক ৭১’। সংগঠনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন, আল রিয়াদ-আদনান অন্তর, মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন খলিলুল্লাহ গাজী এবং মুখপাত্র হিসেবে কাজ করবেন হুমায়ুন কবির জয়।
একই বছরের ১৫ নভেম্বর আত্মপ্রকাশ করে ‘বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টি (বিআরপি)’। জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আত্মপ্রকাশ করা দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক হলেন লন্ডনপ্রবাসী মো. সোহেল রানা। দলটির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ, ঢাবির সাবেক অধ্যাপক মনজুরুল আলম, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ডা. এ টি এম কামরুল ইসলাম, দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ড. আসিফ এস মিজানসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
‘ওয়ার্ল্ড মুসলিম কমিউনিটি’ নামের আরেকটি রাজনৈতিক দল গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর আত্মপ্রকাশ করে হাফেজ মাওলানা মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বে। মুসলিম ঐক্য, ন্যায়বিচার, ইসলামী শিক্ষা, ইসলামী সমাজ, ইসলামী আইন ও ইসলামের অর্থনীতি বাস্তবায়ন করা দলটির মূলনীতি।
ফ্যাসিবাদের বিলোপ ও নতুন জাতীয় সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্য নিয়ে গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে আত্মপ্রকাশ করে ‘জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ’। দলটির সাংগঠনিক প্রধান মোহাম্মদ শফিউর রহমান জানান, জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে জড়িত ছাত্র-জনতার প্রথম রাজনৈতিক দল। তাই ফ্যাসিবাদ বিলোপ করে নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য সবার আগে আন্দোলন গড়ে তুলবে।’ দাবি পূরণ না হলে ২০২৫ সালে নতুন করে গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণা দেবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা।
অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার ইকরামুল খানকে আহ্বায়ক এবং চট্টগ্রামের সিএনএফ ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদকে সদস্যসচিব করে গত বছরের ২৮ নভেম্বর আত্মপ্রকাশ করে ‘বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি’।
এ ছাড়া গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর হানিফ বাংলাদেশীকে আহ্বায়ক করে আত্মপ্রকাশ করে ‘সমতা পার্টি’ নামে আরেকটি রাজনৈতিক দল। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সমতা, বিশ্বাস ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, উদার গণতন্ত্র- এই তিন মূলনীতির ভিত্তিতে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে।
আলোচনায় ছাত্র ও সাবেক কর্মকর্তাদের দল: ইতিমধ্যে ১১টি রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করলেও রাজনীতির মাঠে কোনো আলোচনা তুলতে পারেনি। দলগুলোর নেতৃত্ব কিংবা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়েও নেই কোনো চমক। তবে এখনো আত্মপ্রকাশ না ঘটলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থী এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে আলাদা দুটি দল নিয়ে জনমনে রয়েছে তীব্র আগ্রহ। কারা আসবেন দলগুলোর নেতৃত্বে, এই নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই মানুষের মাঝে। এ দুটি দলই ভোটের মাঠে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা রাজনীতিসংশ্লিষ্টদের।