নজরুলের ৬২০ কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদার তিনটি পদ্ধতিতে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও হুন্ডির মাধ্যমে এসব অর্থ পাচার করা হয়। পাচারকৃত অর্থে তিনি বিদেশে ব্যাপক সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

এছাড়া বিদেশে ১৮টি শেল কোম্পানি (বেনামি প্রতিষ্ঠান) গঠন করে সেগুলোর মাধ্যমে বিনিয়োগ ও মুনাফা অর্জন করেন। তবে সেই মুনাফার অর্থও দেশে ফেরত আনেননি। এসব কার্যক্রমকে অর্থ পাচার হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তদন্তে জানা গেছে, পাচার করা অর্থে তিনটি দেশে গড়া ৮টি সম্পদ ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে, যার মোট বাজারমূল্য প্রায় ৬২০ কোটি টাকা। এসব সম্পদ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। পাচারকৃত অন্যান্য সম্পদের সন্ধানে তদন্ত এখনো চলমান।

সূত্র জানিয়েছে, নজরুল ইসলাম মজুমদারের মালিকানাধীন এক্সিম ব্যাংকের বিদেশে দুটি এক্সচেঞ্জ হাউজ রয়েছে। রেমিট্যান্স আহরণের নামে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেও জালিয়াতি করে অর্থ পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে তদন্তাধীন রয়েছে।

নাসা গ্রুপের অর্থ পাচারের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামেও জালিয়াতির আরও তথ্য মিলেছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাসা গ্রুপের জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত মোট ৬ হাজার ৯৫১ কোটি টাকার সম্পদ এখন পর্যন্ত সরকারের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এর মধ্যে দেশের ভেতরে রয়েছে ৬ হাজার ৩৪১ কোটি টাকার সম্পদ এবং বিদেশে রয়েছে ৬২০ কোটি টাকার সম্পদ। শুরুতে এসব বিদেশি সম্পদের মূল্য ছিল ৬৭০ কোটি টাকা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় সম্পদের মূল্য কিছুটা কমে এসেছে।

বিদেশে পাচার করা ৬২০ কোটি টাকার সম্পদ শনাক্ত করার পর, সেগুলো দেশে ফেরত আনার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। এই সম্পদগুলোর মধ্যে ৫টি অবস্থিত যুক্তরাজ্যে। এছাড়া ইউরোপের দেশ ফ্রান্সের নিকটবর্তী ব্রিটিশ রাজতন্ত্রাধীন স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপরাষ্ট্র জার্সি-তে নাসা গ্রুপের একটি সম্পদের অবস্থান শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল আইল অব ম্যান-এ নাসা গ্রুপের আরও ২টি সম্পদের খোঁজ মিলেছে। দলিল অনুযায়ী এসব সম্পদের সম্মিলিত মূল্য ৩ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি ৪ লাখ ডলারের সমপরিমাণ।

আদালতের নির্দেশে দেশে নাসা গ্রুপের ৮৯০ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া আইল অব ম্যানের বার্কলে ব্যাংক পিএলসিতে নাসা গ্রুপের নামে ২ লাখ ৮০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, জমা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ তদন্তে জানা গেছে, নাসা গ্রুপ যুক্তরাজ্য, হংকং, আইল অব ম্যান ও জার্সিতে গোপন মালিকানায় মোট ১৮টি শেল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছে। এসব বেনামি প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে সেসব বিনিয়োগের তথ্য-উপাত্ত খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি, হাউজিং ও ট্রেডিং ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

বিদেশে নাসা গ্রুপের শনাক্ত করা সম্পদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। ইতোমধ্যে এসব সম্পদের হস্তান্তর ও বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব থেকেও অর্থ উত্তোলন বা স্থানান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। তিনটি দেশের সম্পদ উদ্ধারে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলার ভিত্তিতে আদালত থেকে সম্পদ জব্দের আদেশ পাওয়া গেছে। রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে পাচারকারীরা ওই সম্পদ বিক্রি বা সরিয়ে নিতে না পারেন। তবে এখনো এসব সম্পদের ব্যবহার পাচারকারীর হাতেই রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকার এখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্টেন্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, আইল অব ম্যান ও জার্সির উদ্দেশে পাঠানোর জন্য তিনটি এমএলএআর-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় ওই দেশগুলোর সহযোগিতায় আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।দেশে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর রায় হলে, তা সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে সেসব দেশে সম্পদ উদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। এসব মামলায় বাংলাদেশের পক্ষে রায় এলেই কেবল পাচারকৃত সম্পদের অর্থ দেশে ফেরত আনা সম্ভব হবে।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!