ঢাকায় মাঠ-রাস্তা দখল করে মেলা

ঈদ ও বৈশাখীর মেলার নামে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন দুটি মাঠ, একটি পার্ক ও একটি সড়কের এক পাশ দখল করে ব্যবসা চালাচ্ছেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি। সিটি করপোরেশনের অনুমতি ছাড়াই এসব মেলার আয়োজন করা হয়েছে। একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকাতেও একটি মাঠ দখল করে মেলা বসানো হয়েছে, যার আয়োজকেরাও বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির সম্পত্তি বিভাগের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে মেলা আয়োজনের জন্য বেশ কয়েকটি আবেদন এসেছিল। কিন্তু খেলার মাঠ ও পার্কে মেলা আয়োজনের অনুমতি না দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ বিষয়গুলো দেখভালের জন্য পুলিশকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু এরপরও মেলা ঠেকানো যায়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির যে চারটি জায়গায় মেলা বসানো হয়েছে সেগুলো হলো—ধূপখোলা খেলার মাঠ, নারিন্দার বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা মাঠ, ইংলিশ রোডের মালিটোলা পার্ক এবং ধোলাইখালের প্রধান সড়কের এক পাশের একটি অংশে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটির আওতাধীন মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের প্যারিস রোড খেলার মাঠেও মেলা বসানো হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পার্ক ও খেলার মাঠে যাতে মেলা না বসে সে জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল বলে জানান সংস্থাটির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী। তিনি বলেন, খেলার মাঠ ও পার্কে মেলা বসানোর কোনো অনুমতি তাঁরা দেননি।

তাহলে কেন মেলা বন্ধে সিটি করপোরেশন ব্যবস্থা নিচ্ছে না—এমন প্রশ্নে মোহাম্মদ ফারাবী বলেন, অভিযান চালাতে হলে তাঁদের পুলিশের সহযোগিতা নিতে হয়। তাঁরা ডিএমপিকে অনুরোধ করেছিলেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি পক্ষ খেলার মাঠ ও পার্কে মেলা বসানোর সুযোগ নিচ্ছে।

ক্লাবের আয়ের জন্য খেলার মাঠে মেলা

ঢাকা দক্ষিণ সিটির আওতাধীন এলাকার সবচেয়ে বড় খেলার মাঠ ধূপখোলায় অবস্থিত। ৭ দশমিক ৪৭ একর আয়তনের এই মাঠের নাম দেওয়া হয়েছিল ধূপখোলা আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার মাঠ। ২৫ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে এই মাঠের সংস্কার শেষে ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর উদ্বোধন করা হয়েছিল।৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই প্রথম খেলার মাঠে বাণিজ্যিকভাবে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এই মাঠের দক্ষিণ–পূর্ব কোণে ‘ইস্ট এন্ড ক্লাব’–এর কার্যালয় রয়েছে। মাঠের একটি অংশে ক্লাবের পক্ষ থেকে মেলার আয়োজন করার পোস্টার টাঙাতে দেখা গেছে।

এই ক্লাবের যুগ্ম আহ্বায়ক গেন্ডারিয়া থানা বিএনপির সভাপতি মকবুল হোসেন খান টিপু। ক্লাবের কমিটিতে থাকা বেশির ভাগ ব্যক্তি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের বিষয়ে জানতে চাইলে মুঠোফোনে মকবুল হোসেন খান বলেন, মেলা বসিয়ে তাঁরা কিছু টাকা পেয়েছেন। এই টাকা ক্লাবের তহবিলে জমা হয়েছে। এতে ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা লাভবান হননি। এরপরও মেলা বসিয়ে ভুল হয়ে থাকলে তাঁরা ভবিষ্যতে আর এই কাজ করবেন না।

পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরদিন থেকে এই মাঠের একটি অংশে মেলা বসানো হয়েছে। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত এই মাঠে মেলা চলবে।এই মাঠের পাশের এলাকার বাসিন্দা হুমায়ুন কবির বলেন, খেলার মাঠে এভাবে মেলা বসানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত উচ্চ স্বরে গান বাজিয়ে আশপাশের পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে।

আনন্দমেলার নামে যুবদল নেতার বাণিজ্য

পুরান ঢাকার নারিন্দাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা মাঠেও মেলা বসানো হয়েছে। এই মেলার আয়োজন করেছেন স্থানীয় যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কবির হোসেন। মেলার প্রবেশমুখে থাকা তোরণে তিনটি বড় ডিজিটাল ব্যানার রয়েছে। এর মধ্যে দুটিতে লেখা আছে ‘সার্বিক তত্ত্বাবধানে: কবির হোসেন কবির’।গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো মাঠে শিশু–কিশোরদের জন্য বিভিন্ন রাইড ও খেলনার দোকান বসানো হয়েছে। পাশাপাশি সেখানে খাবারের দোকানও বসানো হয়েছে।

মেলা বসানোর বিষয়ে জানতে চাইলে কবির হোসেন বলেন, তিনি একটি জরুরি কাজে আছেন। কিছুক্ষণ পর কথা বলবেন। এরপর মেলা আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মাহফুজ নামের এক ব্যক্তি এই প্রতিবেদককে কল করে জানান, কবির হোসেন ব্যস্ত আছেন। এই প্রতিবেদকের কী জানার আছে। পরে মেলা বসানোর ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, স্থানীয় বিএনপির নেতাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি এই প্রতিবেদকে সরাসরি দেখা করে কথা বলার অনুরোধ জানান।

জিয়া পরিবারের ছবি টাঙিয়ে মেলা

ইংলিশ রোডে ময়লার ভাগাড়কে দৃষ্টিনন্দন করে পার্কে পরিণত করেছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সেই মালিটোলা পার্কেও মেলা বসিয়েছেন স্থানীয় বিএনপির নেতারা। মেলার প্রবেশমুখে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর ছবি টাঙানো হয়েছে।

গতকাল সেখানে গিয়ে কথা হয় ইয়াকুব জাহিদ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। মেলার আয়োজক তিনি। বংশাল থানা কৃষক দলের সভাপতি হিসেবে তিনি নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন। কার অনুমতি নিয়ে পার্কে মেলার আয়োজন করেছেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কোতোয়ালি থানা থেকে অনুমতি নিয়ে তিনি পার্কে মেলার আয়োজন করেছেন। সিটি করপোরেশনের মাঠে মেলা করতে হলে করপোরেশনের অনুমতি নিতে হয়—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তাঁরা পুলিশের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছেন।পরে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে কথা বলতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

রাস্তা দখল করেও মেলা

পুরান ঢাকার ধোলাইখালের প্রধান সড়কের এক পাশের একটি অংশের দখল করে ঈদের দিন থেকে মেলা বসিয়েছেন স্থানীয় যুবদল নেতা সৌরভ রাসেল। রাস্তা বন্ধ করে মেলা বসানোর কারণে গাড়ি চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।রাস্তায় মেলা বসাতে থানা থেকে অনুমতি নিয়েছেন বলে দাবি করেন সৌরভ রাসেল। তিনি বলেন, মেলার কারণে মানুষের ভোগান্তি যাতে না হয় সে জন্য পুলিশ তাঁকে সহযোগিতা করছে।এ বিষয়ে সূত্রাপুর থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম গতকাল রাত সাড়ে আটটার দিকে বলেন, মেলার কারণে যাতে শৃঙ্খলা নষ্ট না হয় তাই পুলিশ সহযোগিতা করেছে। মেলা রাত ১০টায় (গতকাল) শেষ হয়ে যাবে।

অবৈধ মেলা, দেখার কেউ নেই

মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের প্যারিস রোড খেলার মাঠে যে মেলা চলছে সেখানে ঢুকতে হয় ১০ টাকার টিকিট কেটে। গতকাল দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের চারপাশ টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা। মাঠের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুটি প্রবেশ ফটক করা হয়েছে। চারদিকে সীমানাদেয়াল ঘেঁষে মেলার স্টল করা হয়েছে। মাঠের মধ্যে আরও কিছু স্টল ও প্যাভিলিয়ন (বড় স্টল) করা হয়েছে। এ ছাড়া মাঠের ভেতর শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ১০-১২টি রাইড বসানো হয়েছে।উত্তর সিটির জনসংযোগ কর্মকর্তা মকবুল হোসেইন প্রথম আলোকে বলেন, মেলা আয়োজনের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। মাঠটিতে অবৈধভাবে মেলার আয়োজন করা হয়েছে।

মেলায় স্টল দেওয়া একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একেকটি স্টল বরাদ্দ নিতে ৫০-৬০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। যাঁরা প্যাভিলিয়ন ভাড়া নিয়েছেন, আকারভেদে তাঁদের দিতে হয়েছে এক থেকে দেড় লাখ টাকা। আর যেসব রাইড রয়েছে, এগুলোর টিকিট বিক্রির টাকা মেলা আয়োজনকারী ও রাইড মালিকানা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে ভাগভাগির চুক্তি হয়। পয়লা বৈশাখ (আগামী ১৪ এপ্রিল) পর্যন্ত মেলা চলবে।এই মেলা গত রমজান মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে চলছে। মেলায় স্টল বরাদ্দ নেওয়া বিক্রেতারা জানান, আয়োজকদের কয়েকজন বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতা–কর্মী।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, খেলার মাঠ ও পার্ক রক্ষা না করে করপোরেশন নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। সিটি করপোরেশনের উচিত দ্রুত এসব মাঠ ও পার্ক উদ্ধার করে শিশু–কিশোর ও বাসিন্দাদের ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া। যাঁরা মাঠ ও পার্ক দখলের সঙ্গে যুক্ত তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকে না তাকিয়ে দখলদার হিসেবে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!