গ্রামের ৫৬ শতাংশ পরিবার ভূমিহীন

গ্রামীণ কৃষি খাতে নিয়োজিত বেশিরভাগ পরিবার এখন ভূমিহীন। ৫৬ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কোনো জমি নেই। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি ভূমিহীন পরিবার রয়েছে, আর খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম ভূমিহীন পরিবার রয়েছে। ভূমিবণ্টন ব্যবস্থার এই করুণ চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইএফপিআরআই) এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে। ‘ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন বাংলাদেশ: এভিডেন্স-বেইসড স্ট্র্যাটেজিস ফর অ্যাডভান্সমেন্ট’ শীর্ষক এই প্রতিবেদন খুব শিগগিরই প্রকাশিত হবে, এবং পুরো গবেষণা প্রতিবেদনটি এখন পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে আইএফপিআরআইয়ের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আখতার আহমদ বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় দেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার সব রূপান্তর ও প্রতিবন্ধকতার বিষয়গুলো তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। গবেষণাটি তথ্য ও উপাত্তভিত্তিক বিধায় এটি নীতিকাঠামো তৈরিতে সহায়ক হবে। আমাদের এই গবেষণায় দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন অর্থবহভাবে তুলে আনা হয়েছে।’

গবেষণা প্রতিবেদনটির মতে, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের যথাক্রমে ৬৭.৮ ও ৬৪.৯ শতাংশ পরিবারের কোনো ভূমি নেই।এ ছাড়া ঢাকা বিভাগের ৫৫ শতাংশ গ্রামীণ পরিবারের কোনো ভূমি নেই। অন্যদিকে রংপুর ও বরিশাল বিভাগের ৫৪.৬ শতাংশ পরিবারের কোনো ভূমি নেই। রাজশাহী বিভাগের ৫২.১ এবং খুলনা বিভাগের ৪৭ শতাংশ পরিবারের কোনো ভূমি নেই। কৃষিজমি গুটিকয়েক পরিবারের হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে। নিচের ২৫ শতাংশ পরিবারের কাছে মাত্র ৩.৮ শতাংশ কৃষিজমি রয়েছে।

গ্রামীণ এলাকার ওপরের দিকে থাকা ৫ শতাংশ পরিবারের কাছে গ্রামীণ অঞ্চলের ২৬.৪ শতাংশ আবাদি জমি রয়েছে। এরপর ওপরের দিকের বাকি ১০ শতাংশ পরিবারের কাছে ৩৯.৭ শতাংশ আবাদি জমি রয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, গ্রামের শীর্ষ ১৫ শতাংশ পরিবারের কাছে দেশের গ্রামীণ এলাকার ৬৬.১ শতাংশ কৃষিজমি রয়েছে।
Untitled design 2025 02 21T154726.863
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় আইনি সহায়তার অভাবে মালিকানায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। বিদ্যমান ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশের বাস্তবায়নে বিভিন্ন দুর্বলতা রয়েছে। ভূমি সংস্কারকে এগিয়ে নিতে হলে জমির মালিকানা ও রেকর্ড ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করতে হবে। একদিকে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে কিছু পরিবারের হাতে কৃষি ও আবাদি জমি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার এই পরিবর্তন খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুরশিদ বলেন, দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় এই ধরনের পরিবর্তন সার্বিকভাবে ঝুঁকি তৈরি করছে। কৃষিজমি সংকুচিত হচ্ছে, জমির মালিকানায় পরিবর্তন আসছে এবং অনেক জমির মালিক চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বর্তমানে কৃষিজমির মালিকরা কৃষিকাজ ছেড়ে অন্যান্য খাতে চলে যাচ্ছেন। কৃষি শ্রমিকের অভাবে অনেক পরিবার জমি বর্গা দিতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া অনেক পরিবার বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে শহরের দিকে চলে যাচ্ছে, যার ফলে কৃষিকাজে অংশগ্রহণ কমছে।

বেশিরভাগ বর্গাচাষী টাকার বিনিময়ে জমি ভাড়া নিয়ে চাষাবাদ করেন। তিনি বলেন, তাঁদের সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করতে হলে ঋণের সহজলভ্যতা, প্রযুক্তি ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়াতে হবে। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবের কারণে কায়িক পরিশ্রম কমাতে তরুণরা কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন। জানা গেছে, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৫ শতাংশের বেশি কৃষি খাতে নিয়োজিত, যা প্রায় তিন কোটি ২০ লাখ মানুষ। তবে যেসব কৃষকের জমি নেই, তারা জমি বর্গা নিয়ে চাষ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!