কাজ ছাড়াই প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন মেয়র

নাঙ্গলকোটের মেয়র মালেকের দুর্নীতি

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট পৌরসভার সাবেক মেয়র আব্দুল মালেকের দুর্নীতি কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি। পৌরসভার অধিকাংশ প্রকল্পের বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। কাগজে-কলমে প্রকল্পের নাম দিয়ে তিনি টাকা লুটতেন, এক কথায়, একটি ফ্যাসিস্ট কায়দায় অপকর্ম করতেন। ২০১৬ সালে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি পৌরসভার সব সেক্টরে নিজের লোক নিয়োগ করেন এবং বিধি ভেঙে নিজের ইচ্ছেমতো লুটপাট চালিয়ে যান। তার ক্ষমতার দাপটে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের ১৬ বছর কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে শীর্ষ ক্ষমতাধরদের অন্যতম একজন ছিলেন সাবেক মেয়র এবং যুবলীগ সভাপতি আব্দুল মালেক। সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামালের সান্নিধ্য পেয়ে কুলি থেকে হয়ে যান বড় নেতা। একপর্যায়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। ২০১৬ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচনে ভোট লুট করে মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর থেকে পৌরসভাকে নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেন। অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামালের কাছ থেকে বড় আকারের বরাদ্দ এনে লুটপাট করে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যান। বিভিন্ন ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে নিজেই করতেন সব ঠিকাদারি। নয়ছয় এবং ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে লুটপাট করেছেন কোটি কোটি টাকা। স্থানীয়রা জানান, মেয়র মালেক দম্ভোক্তি করে বলতেন, আওয়ামী লীগ ১০০ বছর ক্ষমতায় থাকবে। আর মালেক আজীবন মেয়র থাকবে। সুতরাং তার অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে কেউ কথা বললে অস্তিত্ব থাকবে না।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পৌরসভার দোলখাঁড় সড়ক হতে ধাতিশ্বর বারিক মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত ৩০০ মিটার সিসি ঢালাইয়ের সড়ক নির্মাণের প্রকল্প দেখিয়ে ২৮ লাখ ৮১ হাজার ৩৬২ টাকা আত্মসাৎ করেন। বাস্তবতা হলো-সেখানে কোনো কাজ হয়নি। দোলখাঁড় এলাকার বাসিন্দা এমরান হোসেন বলেন, এখানে সিসি ঢালাইয়ের একটি সড়ক নির্মাণের কথা ছিল। শুনেছি মেয়র মালেক এই কাজের টাকা আত্মসাৎ করে ফেলেছে।স্থানীয়রা জানান, পৌরসভার মুক্তি বাড়ি হতে আল্ট্রা মডার্ন হাসপাতাল পর্যন্ত ৪০০ মিটার ড্রেন নির্মাণে ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দের মধ্যে মাত্র ১৫-১৬ লাখ টাকার কাজ করে বাকি লুটে নেওয়া হয়। ওই প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।

নাঙ্গলকোট রেলস্টেশনের পাশে টয়লেট নির্মাণ কাজে ২৫ লাখ ৪৫ হাজার ১৬৭ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নামেমাত্র টাকায় একটি টয়লেট বানিয়ে বাকি টাকা লুটে নেওয়া হয়। টয়লেটটি নির্মাণের পর থেকেই ব্যবহারের অনুপযোগী।নাঙ্গলকোট হাছান মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের ২০০ মিটার সড়ক নির্মাণে ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯৬ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়। স্থানীয়দের দাবি সেখানে ১৫-২০ লাখ টাকার কাজ হয়েছে।নাঙ্গলকোট রেলস্টেশনের পাশের কালভার্ট হতে ৫০০ মিটার ড্রেন নির্মাণে ১ কোটি ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ৩৫৮ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়। নামেমাত্র সামান্য কাজ দেখিয়ে নয়ছয় করে ৭০-৮০% টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

পুরাতন হাসপাতাল হতে খলিফা বাড়ি পর্যন্ত ৫০০ মিটার ড্রেন নির্মাণ ১ কোটি ৭৭ লাখ ৩৪ হাজার ২৫১ টাকা। বটতলা হতে উত্তর দিকে ৫৩৬ মিটার ড্রেন নির্মাণ ৩ কোটি ৯২ লাখ ৭৯ হাজার ৫৫৯ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়। এসব ড্রেন নির্মাণে নিজেই ঠিকাদারি করেন মালেক। নির্মাণের কয়েকদিন পরেই এসব ড্রেন ভেঙে পড়ে গেছে। অর্থাৎ নামকাওয়াস্তে কাজ দেখিয়ে বেশিরভাগ টাকা আত্মসাৎ করেন মেয়র মালেক।পৌরসভার বিভিন্ন সড়কে স্ট্রিট লাইট স্থাপন দেখিয়ে ২ কোটি ২৬ লাখ ৬৪ হাজার ৪০০ টাকা লুটে নেওয়া হয়। বাস্তবে এসব লাইটের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক কাউন্সিলর বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরে রাজস্ব আয়সহ মোট আয় ছিল ৪৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তারমধ্যে পুরোটাই ব্যয় দেখানো হয়েছে। ড্রেন নির্মাণে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও হালকা বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় নাঙ্গলকোট পৌরবাজার।পৌরসভায় সোলার লাইট স্থাপনের জন্য প্রতিটি সোলার লাইটের দাম টেন্ডারে দেখানো হয়েছে ৭০ হাজার টাকা করে। বিভিন্ন স্থানে সোলার লাইটের জন্য বেইস ঢালাই দেওয়া হলেও সোলার লাইট না বসিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

নাঙ্গলকোট বাজারে একটি যাত্রী ছাউনি নির্মাণ করে মেয়র মালেক অগ্রিম ৫ লাখ টাকা ও প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে সেটি ভাড়া দিয়ে দেয়। তবে এই টাকা পৌরসভার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি। তিনি পৌরসভার সব বরাদ্দ এবং রাজস্ব লুটে নিয়েছেন।স্থানীয় বাসিন্দা সুমন আহমেদ বলেন, মেয়র আব্দুল মালেক বিভিন্ন কাজের টেন্ডার দেখিয়ে নিজের স্বজনদের দিয়ে কাজ করাতেন। পৌর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ঢালাইয়ের কাজ মেয়র আব্দুল মালেকের ছেলে করেছেন এবং বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। বাস্তবে ৪-৫ লাখ টাকার কাজ করা হয়েছে।হাসান মেমোরিয়াল সরকারি কলেজের শহিদ মিনারের কাজটিও তার ছেলেকে দিয়ে করানো হয়েছে।

নিয়োগে মালেকের স্বজনপ্রীতি

পৌরসভায় ইশরাত জাহান নামে একজনকে পাম্প চালক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যদিও তাকে দিয়ে অন্য কাজ করানো হয়। ইসরাত জাহান বলেন, আমি পাম্প অপারেটর হিসাবে ৩ বছর আগে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছি, তবে আমি বর্তমানে পৌরসভার ইঞ্জিনিয়ার অফিসে দায়িত্ব পালন করি।রহিমা নামে একজনকে অফিস সহায়ক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যিনি মেয়র আবদুল মালেকের আত্মীয়। এছাড়া মেয়রের ভাগিনা নিজাম উদ্দিন কালুকে টিকাদানকারী হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।ইউছুফ নবী নামে একজনকে জিপ চালক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, অথচ পৌরসভায় কোনো জিপ নেই।

পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নিজাম উদ্দিন মজুমদার বলেন, মেয়র মালেক নিজের ভাই, ছেলে ও আত্মীয়স্বজন দিয়ে সব ঠিকাদারি কাজ করিয়েছেন। আমাদের সামান্য কিছু কাজ দিতেন। এরমধ্যে প্রায় অর্ধেক টাকা তাকে দিতে হতো। মেয়র চারটা প্রকল্পে আমার কাছ থেকে ৫০ লাখ ৮১ হাজার টাকা ঘুস নিয়েছেন। ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পৌরসভার বরাদ্দের ৮০% টাকাই সে লুট করে নিয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে রাজস্বের টাকাগুলো আত্মসাৎ করেছে।

নাঙ্গলকোট পৌরসভার ঠিকাদার শাহজাহান ভূঁইয়া বলেন, সাবেক মেয়র আব্দুল মালেক অসংখ্য ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দের অর্থ লুটে নিয়েছে। আমরা এসব লুটপাটের প্রত্যক্ষদর্শী। সে সময় ক্ষমতার বলে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারিনি। তিনি বলেন, প্রকৌশলী সাইফুর রহমানের যোগসাজশে মালেক এসব ভুয়া প্রকল্প সৃজন করে অর্থ লুটে নিয়েছেন।মেয়র আব্দুল মালেকের ছেলে তানভীর মাহবুব অন্তর বলেন, আমার বাবা মেয়র থাকাকালীন ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ এসেছে। তাছাড়া রাজস্ব কত এসেছে সঠিক বলতে পারছি না। তাহলে এর মধ্যে শত শত কোটি টাকা লুট কিভাবে করবে। তিনি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে আর সংবাদ প্রকাশ করিয়েন না। আমরা এমনিতেই অনেক ক্ষতিগ্রস্ত। এলাকায় যেতে পারি না।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!