কাউকে খুশি করতে পিভিসি, পিইটি রেজিনের শুল্ক দ্বিগুণ!

প্লাস্টিক ও বেভারেজ খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হলো পিভিসি ও পিইটি রেজিন। দেশে এসব কাঁচামালের মোট চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এই আমদানিকৃত কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদিত পণ্য দেশে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। তবে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এ কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সিদ্ধান্তে উদীয়মান প্লাস্টিক ও বেভারেজ শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ শুল্ক বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে, ফলে উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।

দেশে পিভিসি রেজিনের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫ লাখ টন এবং পিইটি রেজিনের চাহিদা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন, অর্থাৎ মোট চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টন। বিপরীতে, দেশে পিভিসি রেজিন উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় দেড় লাখ টন এবং পিইটি রেজিনের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ টন। ফলে বড় একটি ঘাটতি পূরণে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এ অবস্থায় শুল্ক বৃদ্ধি পেলে কাঁচামাল আমদানির খরচ সরাসরি বেড়ে যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় ৭০টি দেশে প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করছে। তবুও কাঁচামালের জন্য শিল্পটি এখনও ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। এমন প্রেক্ষাপটে পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক দ্বিগুণ করার প্রস্তাব শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

প্লাস্টিক শিল্পে বিনিয়োগকারীরা বলছেন, দেশে খুব অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পিভিসি ও পিইটি রেজিন উৎপাদন করে। মেঘনা গ্রুপ এ ধরনের কাঁচামাল উৎপাদন করে। আমদানি শুল্ক বাড়ানো হলে স্বাভাবিকভাবেই সুরক্ষা পাবেন স্থানীয় উৎপাদকরা। কারণ আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে গেলে ক্রেতারা স্থানীয় সরবরাহকারীদের থেকে কিনতে বাধ্য হবেন। এতে তারা লাভবান হবেন। কিন্তু এ পরিমাণ দিয়ে পুরো শিল্পের চাহিদা পূরণ করতে সকসম্ভব নয়। ফলে বেশি শুল্কে আমদানির ওপরই নির্ভর করতে হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্লাস্টিক ও বেভারেজ শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এতে শুধু প্লাস্টিক শিল্প নয়, নির্মাণ, প্যাকেজিং, বেভারেজ, বৈদ্যুতিক, ইলেকট্রনিকস ও অটোমোবাইলসহ বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পড়তে পারে।

পিভিসি ও পিইটি রেজিন প্লাস্টিক শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। পিভিসি রেজিন ব্যবহার করে পাইপ, ফিটিংস, পানির ট্যাংক, ফ্লোরিং উপকরণ, বৈদ্যুতিক তার ও ক্যাবলের আবরণ, কৃত্রিম চামড়া এবং জুতার সোল তৈরি করা হয়। অন্যদিকে পিইটি রেজিন দিয়ে পানীয় ও খাদ্যপণ্যের বোতল, কনটেইনার, ওষুধের প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে প্লাস্টিক শিল্প বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। এ খাতে ৫ হাজারেরও বেশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার প্রায় ৯৮ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই)। পাশাপাশি প্রাণ-আরএফএল, বেঙ্গল প্লাস্টিক, আকিজ প্লাস্টিক, ন্যাশনাল পলিমার, আনোয়ার গ্রুপ ও এসিআইয়ের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও এ খাতে বিনিয়োগ করেছে।

উদ্যোক্তাদের মতে, আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি পেলে পাইপ, ফিটিংস, পানির ট্যাংক, বেভারেজ বোতল, বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজিং সামগ্রী, বৈদ্যুতিক তারের আবরণ, কৃত্রিম চামড়া ও জুতাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এর প্রভাবে এসব পণ্যের বাজারমূল্যও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে রেজিনের দাম আগেই ঊর্ধ্বমুখী। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন করে শুল্ক বৃদ্ধি শিল্প উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে গিয়ে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।

খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত রেজিনের দাম আমদানিকৃত রেজিনের তুলনায় প্রতি কেজিতে প্রায় ১০ টাকা বেশি। তাই শুল্ক বাড়ানোর পরিবর্তে স্থানীয় উৎপাদনের ব্যয় কমানো, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি, দেশে রেজিন উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের আগে পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক ৫ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। অন্যথায় শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়বে ভোক্তাদের ওপরও।

আনোয়ার গ্রুপ ইন্ডাস্ট্রিজের ডিএমডি ওয়াইজ হোসেন বলেন, নির্মাণ খাতে দীর্ঘদিনের মন্দার কারণে পিভিসি পণ্যের চাহিদা কমে গেছে এবং অনেক প্রকল্প স্থবির হয়ে আছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে রেজিনের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ অবস্থায় পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক এবং কাস্টমস মূল্যায়ন বাড়ানো হলে শিল্পখাতের ব্যয় আরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এতে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) পিভিসি কারখানাগুলো বড় সংকটে পড়বে এবং অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এর ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ, উৎপাদন কার্যক্রম এবং সরকারের রাজস্ব আদায়—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি সেচের কাজে ব্যবহৃত পিভিসি পাইপের দাম বেড়ে গেলে কৃষি উৎপাদনেও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই শুল্ক বৃদ্ধি দেশের শিল্প ও অর্থনীতির জন্য সহায়ক হবে না বলে তিনি মনে করেন।

আরএফএল গ্রুপের মার্কেটিং পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, পিভিসি রেজিন ও পিইটি রেজিন— এই দুই ধরনের কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক বাড়ানোর প্রভাব বিভিন্ন শিল্পে পড়বে। পিভিসি রেজিন দিয়ে পাইপ, ফিটিংসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি হয়, যা কৃষি, আবাসন, স্যানিটেশন, পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। ফলে এই কাঁচামালের দাম বাড়লে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোয় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পিইটি রেজিন প্রধানত প্যাকেজিং শিল্পে ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। খাদ্য, পানীয়, ওষুধ, অনলাইন শপিং ও খুচরা বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে প্যাকেজিংয়ের জন্য এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে এ কাঁচামালের দাম বাড়লে সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোর উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাবে এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর। একই সঙ্গে প্যাকেজিং, টেক্সটাইল ও ওষুধ শিল্পসহ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোও বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়বে। দেশে প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে এবং বিভিন্ন খাতে এর ব্যবহার উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে কাঁচামালের শুল্ক বৃদ্ধি শুধু শিল্পখাতেই নয়, ভোক্তাদের ওপরও অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।