কর ছাড়ে লাভ ব্যবসায়ীর, ভোক্তা বঞ্চিত

উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষের বাজার ব্যয় কমাতে সরকার ৬০টির বেশি কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর হ্রাস করেছে। চাল, আটা, তেল, চিনি, মাছ, খেজুরসহ পেঁয়াজ, রসুন, আদা, জিরা, এলাচি, দারুচিনির মতো মসলাজাতীয় পণ্যে স্বস্তি আনতে নতুন বাজেটে বিভিন্ন কর সুবিধা দেওয়া হয়। এতে ভোক্তাদের প্রত্যাশা ছিল, কর কমার ফলে আমদানি ও বিপণন খরচ কমে খুচরা বাজারেও দাম কমবে। কিন্তু বাস্তবে খুচরা বাজারে এর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। বরাবরের মতো করছাড়ের সুফল মূলত ব্যবসায়ীরাই পাচ্ছেন। উল্টো অনেক পণ্যের দাম কমার পরিবর্তে এখনও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে, যা ভোক্তাদের হতাশ করেছে।

দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি গত জুনে কিছুটা কমলেও তা এখনো ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে; তবে খাদ্যখাতে তা এখনো ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। ফলে ভোক্তাদের খাদ্যপণ্যের জন্য আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি খরচ করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে স্বস্তি দিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৬৩টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি মসলাজাতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও তুলে নেওয়া হয়েছে। সাধারণত বাজেটের এসব কর-শুল্ক প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়। ফলে ব্যবসায়ীরা এর সুবিধা পেলেও বাজারে এখনো পণ্যের দামে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীদের দ্বিমুখী আচরণ এবং বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর একপাক্ষিক নীতির কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা কমছে না। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে সরকারের কঠোর ভূমিকা নেওয়ার কথা থাকলেও আগের মতোই ব্যবসায়ীবান্ধব অবস্থান বজায় রয়েছে। রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী মো. এনামুল হক জানান, নতুন বাজেটে নিত্যপণ্যে করছাড়ের খবর শুনে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন; কিন্তু বাস্তবে বাজারে কোনো পণ্যের দামই কমেনি। বরং চাল, তেল, মুরগি ও মাছসহ বেশিরভাগ পণ্যের দামই বেশি রয়েছে। অন্যদিকে মাতুয়াইল এলাকার অটোরিকশাচালক কাশেম মোল্লা বলেন, সরকারের নানা উদ্যোগের সুফল সাধারণ মানুষ পায় না। নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সেখানে ১-২ টাকা কমলেও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য তা বড় স্বস্তি হতে পারে।

বাজার বিশ্লেষক গোলাম রহমান বলেন, হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনেক পণ্যের বাজার ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করায় বাজারে প্রতিযোগিতায় ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এটা থেকে বের হতে হবে। সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি চাঁদাবাজি, অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি—এগুলো বন্ধ করা গেলে তা কর ছাড়ের চেয়ে আরও বেশি কার্যকর হবে। কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, নীতিগত সিদ্ধান্তের চেয়ে বাস্তবায়নের সক্ষমতা কতটুকু আছে, তার ওপর এর নির্ভর করছে সুফল মিলবে কি না। শুল্ক-কর সুবিধা ভোক্তারা পাচ্ছে কি না, সেটার জন্য নজরদারি প্রয়োজন।

চালের বাজার নিয়ে কথা হলে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল মালিক সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লায়েক আলী বলেন, মূলত আবহাওয়াজনিত কারণে বাজার চড়া। বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এনায়েত উল্লাহ বলেন, বাজেটে এক রকম বলা হয়, পরে এসআরও দিয়ে আরেক নিয়ম চলে। এটা এক ধরনের ‘প্রতারণা’। মসলায় ট্যারিফ বেশি ধরে অত্যধিক হারে ডিউটি নেওয়া হচ্ছে। এলাচ, লবঙ্গ, জিরার মতো মসলা চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে ঢুকছে। এগুলোর কারণে বাজারে তেমন কোনো প্রভাব নেই।

ভোজ্যতেলের বিষয়ে পরিশোধনকারীদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি ও মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা জানান, শুল্ক-কর কমানোর প্রভাব এখনো বাজারে পুরোপুরি পড়েনি। যদিও তেলের দাম নির্ধারণ নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। অন্যদিকে পোলট্রি পণ্যের দাম প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, ফিড, বাচ্চাসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেশি হয়েছে। পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের প্রভাবও রয়েছে। তাই পোলট্রি পণ্যের দামে স্বস্তি আনতে হলে আগে উৎপাদন খরচ কমানো জরুরি।