আমদানি-রপ্তানি ব্যবসাকে আরো সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। বাণিজ্য সহজীকরণের অংশ হিসেবে অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) সিস্টেম চালু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আমদানি-রপ্তানিতে স্বচ্ছতার পরিচয় দেওয়া ১০টি প্রতিষ্ঠানকে এইও সনদ দেওয়ার মাধ্যমে রোববার (২৩ ফেব্রুয়ারি) এনবিআর সম্মেলন কক্ষে সিস্টেমটি উদ্বোধন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউনিলিভার বাংলাদেশের চেয়ারম্যান জাভেদ আখতার। অনুষ্ঠানে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে এইচএস কোডসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যসংবলিত ওয়েবসাইট ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট হাব এবং কাস্টমস স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ২০২৪-২৮ এর উদ্বোধন করা হয়।
সনদ পাওয়া ১০টি প্রতিষ্ঠান হলো—ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ফেয়ার ইলেকট্রনিকস, এসিআই গোদরেজ অ্যাগ্রোভেট, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস, বাংলাদেশ স্টিল রিরোলিং মিলস (বিএসআরএম), জিপিএস ইষ্পাত, টোয়া পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ডিভাইস বাংলাদেশ, বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ ও ইউনিলিভার বাংলাদেশ।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, এইও সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ অটোমেটেডে পদ্ধতিতে এসকল প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রণীত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুসরণ করে আমদানি করা পণ্য অতি দ্রুত খালাসে এবং রপ্তানি পণ্যের শুল্কায়নে বিশেষ সুবিধা প্রাপ্য হবে। এখন থেকে এইও লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ ২০ শতাংশ পণ্য চালান স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেরাই শুল্কায়ন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কোনরূপ হস্তক্ষেপ ছাড়াই এইও সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ নিজেরাই শুল্কায়নের মাধ্যমে শুল্ক-করাদি পরিশোধ করে সরাসরি জাহাজ থেকে আমদানি করা পণ্য নিজেদের গুদামে নিতে পারবেন। এছাড়া, এইও সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের পণ্য চালান সমূহের ৫০ শতাংশের কম পণ্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতাধীন থাকবে। এ সকল প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের যে সকল পণ্যের রাসায়নিক পরীক্ষা প্রয়োজন সেসকল পণ্যের রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়াই সাময়িক শুল্কায়ন করে খালাস করতে পারবেন, অগ্রিম রুলিং এর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন এবং যেক্ষেত্রে ব্যংক গ্যারান্টির প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টি এবং ২৫ শতাংশ অঙ্গীকার প্রদানের মাধ্যমে মালামাল খালাসের সুবিধা পাবেন। এর ফলে আইন মান্যকারী করদাতা প্রতিষ্ঠানের সময় ও ব্যয় উভয়ই উল্লেখযোগ্য পরিমানে হ্রাস পাবে।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, ২০১৮ সালের এইও বিধিমালার আলোকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে এইও সনদ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুনে নতুন বিধিমালা করা হয়। নতুন এ বিধিমালার আলোকে এখন পর্যন্ত ১০টি প্রতিষ্ঠান এ সনদের শর্ত পূরণ করেছে। আজ তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ বিতরণ করা হয়। উল্লেখ্য, এই ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আগের বিধিমালার আওতায় সনদ পাওয়াদের থেকে ৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নতুন বিধিমালা মেনে সম্পূর্ণ নতুন দুটি প্রতিষ্ঠান এইও সনদ পেয়েছে। অন্যদিকে, পুরোনো বিধিমালার আলোকে সাতটি প্রতিষ্ঠানের এইও সনদ আছে। তারা নতুন বিধিমালার আলোকে সনদ নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে। তাতে দুই বিধিমালা মিলিয়ে ১৭টি প্রতিষ্ঠানের এইও সনদ রয়েছে।
এইও সনদ পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বার্জার পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রূপালী চৌধুরী ও ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের পরিচালক মেজবাহ উদ্দীন আহমেদ। রূপালী চৌধুরী বলেন, কমপ্লায়েন্স অর্জন ব্যয়সাপেক্ষ বিষয়, যদিও কমপ্লায়েন্স অর্জন করলে দক্ষতা বাড়ে। দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে এইও। আজ যারা এই সনদ পেয়েছে, তারা বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দূত হিসেবে কাজ করতে পারে।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘আমাদের সিস্টেমে কিছু লোক সব ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্স মানার চেষ্টা করে; আবার কিছু লোক সব জায়গাতেই ফাঁকি দেয়। এটা চলতে পারে না। এ কারণে ভালো প্রতিষ্ঠানের জন্য এইও সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা বিশেষ সুবিধা পাবে। ফলে আমরা এখন এইও তথা কমপ্লায়েন্স অর্জনের প্রতিযোগিতা দেখতে চাই।’ আবদুর রহমান খান বলেন, দেশের মোংলা ও পানগাঁও বন্দর দিয়ে অনেক বেশি পণ্য আমদানি হয় না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই দুই বন্দরে পণ্যের চাপ কম থাকায় এখানে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, ভুল-ত্রুটি বেশি বেশি বের করা হয় (কাস্টমস কর্মকর্তারা)। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যের চাপ বেশি থাকে। ফলে অনেক পণ্য যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া বের হয়ে যায়। এ কারণে অনেকে মোংলা বা পানগাঁওয়ের পরিবর্তে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আনতে উৎসাহী হয়। আবদুর রহমান খান বলেন, এইও চালুর ফলে পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যের চাপ কমে আসবে। তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা আরও সহজ হবে। সমান সুবিধা পেলে মোংলা ও পানগাঁও বন্দরও কম ব্যবহূত অবস্থায় থাকবে না।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, এইও পুরোপুরি চালু হলে এনবিআর ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় উভয়ের ক্ষেত্রেই চাপ কমবে। সরকারের অন্যান্য সংস্থাও এইও প্রকল্প থেকে অভিজ্ঞতা নিতে পারে।