বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী নাবিল গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংকিং নীতি ও প্রচলিত চর্চা লঙ্ঘন করে এক ব্যাংকের অর্থ দিয়ে অন্য ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। চরম তারল্যসংকট, বিপুল খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) নিজেই আর্থিক চাপে থাকার সময় নাবিল গ্রুপের জন্য বড় অঙ্কের ঋণসুবিধা অনুমোদন করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ইউসিবি থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ দিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকে থাকা নাবিল গ্রুপের ২২০ কোটি টাকার দায় পরিশোধ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি নাবিল গ্রুপের জন্য ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদ মোট ১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকার ঋণসুবিধা অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে প্রিমিয়ার ব্যাংকের দায় পরিশোধে ৫২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বরাদ্দের প্রথম কিস্তি হিসেবে ইউসিবির চেকের মাধ্যমে প্রিমিয়ার ব্যাংককে ২২০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গত সপ্তাহে ইউসিবির চেকের মাধ্যমে ২২০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। বাকি ৩০০ কোটি টাকাও দ্রুত পরিশোধ করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, এ ধরনের চর্চা অনৈতিক এবং ভালো ব্যাংকিং প্র্যাকটিসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী এক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অন্য ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের কোনো সুযোগ বা বিধান নেই। তবে আইন ও বিধি মেনে কোনো ঋণ ‘টেকওভার’ করার সুযোগ রয়েছে।
তথ্য-নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, নাবিল গ্রুপের জন্য ইউসিবিতে আগে অনুমোদিত ৮৪৫ কোটি টাকার ঋণসীমার সঙ্গে আরও ১ হাজার ২০ কোটি টাকা যুক্ত করা হয়েছে। এতে গ্রুপটির জন্য ইউসিবিতে অনুমোদিত মোট ঋণসীমা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা। ঋণের অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার নিশ্চিত করা ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো ঋণসুবিধার অর্থ অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহৃত হলে নতুন বিনিয়োগ বা উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে এক ব্যাংকের দায় অন্য ব্যাংকের কাছে স্থানান্তরের বিষয়টি সামনে আসে।
নথিতে বলা হয়েছে, এই সমন্বিত ঋণসীমা নাবিল গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারবে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—নাবিল নাবা ফুডস লিমিটেড, নাবিল ফিড মিলস লিমিটেড, নাবিল অটো ফ্লাওয়ার মিল, শিমুল এন্টারপ্রাইজ ও নাবিল এডিবল অয়েল লিমিটেড। বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার আগে ব্যাংকের পাওনা সুরক্ষিত করতে জামানত বা স্থাবর সম্পদের ওপর ব্যাংকের আইনগত দাবি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নাবিল গ্রুপের ক্ষেত্রে ব্যাংকের অনুকূলে সম্পদের ওপর প্রয়োজনীয় আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৩৬০ দিন বা এক বছর সময় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অতীতের বিভিন্ন অনুসন্ধানে নাবিল গ্রুপের বিরুদ্ধে ভুয়া বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া এবং পর্যাপ্ত জামানত না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জামানতের আইনগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সময় দেওয়ার প্রস্তাব ব্যাংকটির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, এক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধের ঘটনা ব্যাংকিং খাতে নতুন নয়। কোনো ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ দিলে অনেক সময় অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই দায় পরিশোধ করা হয়। তবে কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ যদি সরাসরি অন্য ব্যাংকের ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে নতুন ঋণ অনুমোদন করে, তাহলে তা আইনানুগতার প্রশ্ন তৈরি করে। ঋণ অনুমোদনের আগে পর্ষদের উচিত ঋণের প্রয়োজনীয়তা, গ্রাহকের ব্যবসা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা। অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধের জন্য ঋণ অনুমোদন করা ভালো ব্যাংকিং চর্চা নয়।
ইউসিবি থেকে ঋণ নিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের দায় পরিশোধের অভিযোগ এবং এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী এক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অন্য ব্যাংকের ঋণ শোধ করার কোনো সুযোগ বা বিধান নেই। তবে আইন ও বিধি মেনে কোনো ঋণ ‘টেকওভার’ করার সুযোগ রয়েছে। ইতিহাসেরবই পড়ুন
আইন লঙ্ঘনের ঘটনা প্রমাণিত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর অবস্থানে থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, যেখানেই আইনের লঙ্ঘন ঘটবে সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই হস্তক্ষেপ করবে। ইউসিবির ক্ষেত্রে যদি আইন লঙ্ঘন করে এভাবে ঋণ অনুমোদন বা ব্যবহারের ঘটনা ঘটে থাকে তবে তদন্ত সাপেক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক বিধি মোতাবেক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে।নাবিল গ্রুপকে এ ধরনের সুবিধা দেওয়ার কারণ জানতে ইউসিবির চেয়ারম্যান শরীফ জহীর ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দেওয়া হলেও তারা কোনো উত্তর দেননি। নাবিল গ্রুপকে এ ধরনের বড় অঙ্কের অর্থায়নের সিদ্ধান্ত এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন ইউসিবি নিজেই মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি মেটানোর পথ খুঁজছে।
২০২৫ সালের শেষে ইউসিবির নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকটির মোট ৬১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ৭ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংক সংরক্ষণ করতে পেরেছিল ২ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ৫ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা। অন্যান্য সমন্বয়সহ মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা।
একই সময়ে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা এবং মূলধন ও ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) নেমে এসেছিল ৮ দশমিক ৪২ শতাংশে যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার নিচে। ইউসিবি রাইটস শেয়ার ইস্যু ও অন্যান্য উপায়ে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে অবশ্য জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে তারা নতুন আমানত বাড়াতে পেরেছে, ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) কিছুটা কমেছে এবং খেলাপি ঋণ আদায়েও অগ্রগতি হয়েছে। তবে পূর্ণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গেলে ইউসিবির প্রকৃত মূলধন ঘাটতি প্রায় ৫ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকায় দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংকে নাবিল গ্রুপের নিজস্ব নামে অনুমোদিত ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি গ্রুপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে আরও প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিহাসেরবই পড়ুন সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ঘিরে। ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেই নাবিল গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে ৩ হাজার ৪৭ কোটি টাকার ঋণের তথ্য ছিল। তবে বিভিন্ন তদন্তে কাগুজে প্রতিষ্ঠান ও অন্য ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে ইসলামী ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।
নাবিল গ্রুপের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মচারী, আত্মীয়স্বজন ও অপরিচিত ব্যক্তিদের নামে কাগুজে প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক মামলা করেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইসলামী ব্যাংকের ৯৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমীনুল ইসলামসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ‘নাবা অ্যাগ্রো ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৬৭০ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন এবং ৩৬৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা ও নাবিল গ্রুপের এমডির বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ‘জামান সিন্ডিকেট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলামী ব্যাংকের পাবনা শাখা থেকে ১ হাজার ৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরও একটি মামলা করা হয়। এছাড়া বিতর্কিত এস আলম গ্রুপের প্রধান সাইফুল আলমের সঙ্গে নাবিল গ্রুপের এমডি আমীনুল ইসলামের ব্যবসায়িক ও আর্থিক যোগসাজশের তথ্য তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে দায়ের হওয়া একটি ঋণ জালিয়াতির মামলায় সাইফুল আলম ও আমীনুল ইসলামকে যৌথভাবে আসামি করা হয়েছে।
