আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহেই নতুন পে-স্কেলের গেজেট

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ধাপ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে মন্ত্রিসভা, এবং সব প্রক্রিয়া শেষে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে গেজেট জারি হতে পারে; তবে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এটি ১ জুলাই থেকেই কার্যকর ধরা হবে। বুধবার জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫–এর সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। জানা গেছে, নতুন পে স্কেলের মূল কাঠামো চূড়ান্ত হলেও সচিব কমিটি আরও দুই থেকে তিন দিন কারিগরি দিকগুলো পর্যালোচনা করবে। এরপর তাদের সুপারিশ চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ বা আগস্টের প্রথম সপ্তাহে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি আইনি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে এবং প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদনের পর গেজেট জারি করা হবে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় ঘোষণা দেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা হবে এবং তা ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে বাস্তবায়ন কমিটি তিন ধাপে এ কাঠামো কার্যকরের সুপারিশ করলেও পরে তা দুই ধাপে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে সর্বশেষ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রিসভা। কারণ, বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে কমিশন জানিয়েছে। এ বিপুল অর্থ কীভাবে জোগান দেওয়া হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকেই হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন সচিব কমিটির সদস্যরা।

বৈঠক শেষে কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের প্রায় ১১ বছর ধরে বেতন বাড়েনি। তাই নতুন পে স্কেলে যেন কারও বঞ্চনা বা ক্ষোভ না থাকে, সে জন্য ভালোভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ জন্য আরও দুই থেকে তিনটি সভা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর আগস্টের শুরুতে গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে। তিনি বলেন, বাড়তি বেতন-ভাতা দেওয়ার সঙ্গে অনেক অর্থের সংশ্লেষ রয়েছে। এর সঙ্গে সরকারের সক্ষমতার বিষয় আছে। তাই নতুন পে স্কেল কয় ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে সচিব কমিটি কোনো মতামত দেবে না। এ বিষয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

জানা যায়, নতুন বেতন কাঠামোয় শুধু মূল বেতন নয়; বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাবও রয়েছে। এসব সুবিধার বিষয়ে একাধিক এসআরও (বিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রক আদেশ) জারি করতে হবে। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বুধবার কমিটির বৈঠক শেষে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত এসআরও এবং বিধিবিধানের খসড়া তৈরি করতে বলা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বিগত পে স্কেলের চিত্র তুলে ধরতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কমিটির নির্দেশনার আলোকে কাজ করছেন।

সর্বশেষ পে-স্কেল বাস্তবায়ন হয়েছে দুই ধাপে

সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, ২০১৫ সালের পে স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়িত হয়েছিল—প্রথম বছরে বেতন এবং পরের বছর ভাতা দেওয়া হয়। তাঁর মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটেও দুই ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়নই বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে। সচিব কমিটি এ বিষয়ে একাধিক প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করতে পারে, এরপর মন্ত্রিসভাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। কমিশন প্রস্তাব করেছে, সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে।

এ ছাড়া বৈশাখী ভাতার হার বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বেতন কমিশনের এসব সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রধান দায়িত্ব হলো—জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন ২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি ২০২৫-এর জমা দেওয়া প্রতিবেদনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সুপারিশ প্রদান করা।