পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক একেএম শহিদুল হক, তার পরিবার এবং ফাউন্ডেশনের নামে ৭২টি ব্যাংক হিসাবে ৫৬০ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে। তাদের নামে রাজধানীতে উচ্চমূল্যে ফ্ল্যাট ও ফ্লোর স্পেস রয়েছে, এর মধ্যে একটি ফ্ল্যাট ব্যাংক থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন, যা পরে ব্যাংকের কাছে ভাড়া দিয়ে বড় অংকের টাকা আদায় করেছেন।
শহিদুল হক তার ক্ষমতা এবং পদ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেছেন। এসব অর্থ তার পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়, যা অস্বাভাবিক মনে করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এই বিষয়ে আরও তদন্তের জন্য বিএফআইইউ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)কে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।
উল্লেখ্য, শহিদুল হক আওয়ামী লীগের নৌকা নিয়ে হাসিনার সবশেষ পাতানো নির্বাচনে লড়তে মনোনয়ন তুলেছিলেন। তবে গত দেড় দশক ধরেই তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে গোটা পুলিশ প্রশাসনে একটি বলয় তৈরি করেছিলেন। গত ৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াদুদ হত্যা মামলায় শহীদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, শহিদুল হক ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত আইজিপির দায়িত্ব পালন করেন। শহিদুল হক, তার স্ত্রী শামসুন্নাহার রহমান, তাদের সন্তান রাকিব বিন শহীদ, সাকিব বিন শহীদ ও শামস বিন শহীদ অনঘের নামে ৭২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের খোঁজ মিলেছে। এর মধ্যে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান মজিদ-জরিনা ফাউন্ডেশনের অ্যাকাউন্টও রয়েছে। এসব হিসাবে গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৬০ কোটি ২৮ লাখ টাকা জমা করা হয়েছে।এর মধ্যে ৫৫০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়। বর্তমানে জমা রয়েছে ১০ কোটি ২০ লাখ টাকা। এছাড়া তার একটি ঋণ হিসাবে মোট ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা জমা করা হয়। এই হিসাব থেকে তুলে নেওয়া হয় ৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। বর্তমানে ঋণ হিসাবে ১১ লাখ টাকার বেশি ঋণাত্মক রয়েছে। অপরদিকে তার স্ত্রী শামসুন্নাহার রহমানের দুটি আরএফসিডি অ্যাকাউন্টে ২ লাখ ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার জমার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৫ হাজার মার্কিন ডলার তুলে নেওয়া হয়। বাকি ৭০ হাজার ৫৮১ ডলার জমা রয়েছে।
উল্লেখ্য, শহিদুল হক আওয়ামী লীগের নৌকা নিয়ে হাসিনার সবশেষ পাতানো নির্বাচনে লড়তে মনোনয়ন তুলেছিলেন। তবে গত দেড় দশক ধরেই তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে গোটা পুলিশ প্রশাসনে একটি বলয় তৈরি করেছিলেন। গত ৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াদুদ হত্যা মামলায় শহীদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অনুসন্ধান করে দেখা যায়, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে শহিদুলের একটি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এই হিসাব ১ কোটি ৬৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জমাপূর্বক খোলা হয়। হিসাবটি খোলার পর থেকে নিয়মিত ভাড়া বাবদ বড় অংকের অর্থ জমা করা হয়েছে। এই ব্যাংক থেকেই তাকে প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি ৪ হাজার ৫৭১ বর্গফুট ফ্ল্যাট উপহার দেওয়া হয়।সেই ফ্ল্যাট আবার তিনি ব্যাংকের নিকট ভাড়া দিয়ে বড় অংকের টাকা নেন। এছাড়া পদ্মা ব্যাংকে তার নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবে ১৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জমা হয়। এই হিসাব থেকে ১৪ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে সানিবুর রহমান, নুরুল ইসলাম ঢালি ও ইমরান ব্যাপারীর মাধ্যমে। এছাড়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইরা বিল্ডার্সের হিসাবে বড় অংকের অর্থ স্থানান্তর করা হয়।
বিপুল পরিমাণ সম্পদ
শহিদুল হক ও তার স্ত্রীর নামে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১৪,৫০০ বর্গফুট ফ্লোর স্পেস রয়েছে, যার বাজারমূল্য ৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে শহিদুলের নামে বাড্ডায় ৪,৫৭১ বর্গফুট স্পেসের মূল্য ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং উত্তরায় ৬,০০০ বর্গফুট স্পেসের মূল্য ৩ কোটি টাকা। এসব ফ্লোর স্পেস অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে কেনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মজিদ-জরিনা ফাউন্ডেশনে ৭৫ কোটি টাকা
শহিদুল হক ও তার বাবা-মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত মজিদ-জরিনা ফাউন্ডেশন একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, যা মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পরিচালিত। তবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরও এতে ৭৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় অংকের নগদ অর্থ একসঙ্গে জমা হওয়ার পর, তা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তোলন করা হয় এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানান্তর করা হয়। এছাড়া ফাউন্ডেশনের নামে জমা অর্থ তার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইরা বিল্ডার্সের হিসাবে পাঠিয়ে ভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা হয়।
শহিদুল হক এবং তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব থেকে জানা যায়, শহিদুলের মাসিক আয় মাত্র ৪ লাখ টাকা, যা তিনি অবসরোত্তর ব্যবসা-সারস শিপিং লাইন থেকে উপার্জন করেন, আর তার স্ত্রী একজন নামমাত্র ব্যবসায়ী। তবে, তাদের ব্যাংক হিসাবগুলোতে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা জমা হয়েছে এবং তাদের নামে উচ্চমূল্যে ফ্ল্যাট রয়েছে, যা ব্যাংকের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত তথ্য সন্দেহজনকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন,একজন আইজিপি, যিনি সরকারি চাকরিতে থাকাকালে ব্যবসা করার কনো সুযোগ নেই, তার সব মিলিয়ে আয় ছিল এক লাখ টাকা। তবে, এসব টাকা তিনি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে অর্জন করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।