ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে অপারেটর ফোরাম (আইওএফ) এর ফান্ড থেকে সালমান এফ রহমানের প্রতিষ্ঠানের নামেই লোপাট হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। রাজস্ব হিসেবে এই ফান্ডে জমা হওয়া টাকা লুট করেছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের ছত্রছায়ায় থাকা বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান। তবে শেষ রক্ষা হচ্ছে না। সরকারের এই টাকা লোপাটের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন বিশেষায়িত আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট। সম্প্রতি এই তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে। রোববার আয়কর গোয়েন্দার একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিজনেস বার্তাকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনাটি সামনে আসার পর আমরা তদন্ত শুরু করেছি। এর মধ্যে এই খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাগজপত্র ও লুট হওয়া অর্থের খোঁজ নেয়া শুরু করেছি। আশা করি এই লুটের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারবো।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমোদনে চালু হয় আইওএফ। বলা হয়েছিল, বৈধ ফোনকল আদান-প্রদানে শৃঙ্খলা আনা ও রাজস্ব ফাঁকি রোধই এর মূল লক্ষ্য। তবে বাস্তবে এ প্ল্যাটফরম তৈরি করে মাত্র ৭টি ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে অপারেটরকে (আইজিডব্লিউ) কল টার্মিনেট করার একচেটিয়া সুবিধা দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কল বাজার নিয়ন্ত্রণ করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। বাড়ানো হয় কলরেট। তবুও সরকার, মোবাইল অপারেটর বা আইসিএক্স কোনো বাড়তি রাজস্ব পায়নি। বরং বাড়তি অর্থ চলে যায় আইওএফ সিন্ডিকেটের হাতে।
আন্তর্জাতিক কল নিয়ন্ত্রণে গঠিত কমন ইন্টারন্যাশনাল পয়েন্ট (সিআইপি) এবং কল আদান-প্রদানের একচেটিয়া কাঠামো একদিকে যেমন একটি গোষ্ঠীর ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক হয়েছে, তেমনি রাজস্ব আত্মসাতের পথও করে দিয়েছে প্রশস্ত। আইওএফ-এর ছত্রছায়ায় সুবিধা পেয়েছে সাতটি প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে রয়েছে ইউনিক ইনফোওয়ে, ডিজিকন টেলিকমিউনিকেশনস, রুটস কমিউনিকেশনস, গ্লোবাল ভয়েস, মীর টেলিকম ও বাংলা ট্র্যাক। এসবের মধ্যে গ্লোবাল ভয়েসে সালমান এফ রহমানের ছেলে শায়ান এফ রহমানের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, কল বণ্টনে অনিয়ম ও প্রকৃত দর গোপন করে সরকারের বিপুল রাজস্ব ফাঁকির নেপথ্যে ছিল এ আইওএফ চক্র। এর মূল কৌশল ছিল আন্তর্জাতিক কলের একটি অংশ থেকে প্রাপ্ত ৪ শতাংশ অর্থ মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (এমডিএস) নামে এক ফান্ডে জমা করা, যেটির প্রায় পুরোটাই গেছে সালমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো কম্পিউটারস লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে।
আইওএফ-এর ব্যাংক স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আইজিডব্লিউ খাতসংশ্লিষ্ট ‘মার্কেট ডেভেলপমেন্ট এক্সপেন্স’-এর নামে ফান্ডে জমা হয় ৬৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশের বেশি অর্থই খরচ হয়েছে বেক্সিমকো কম্পিউটারস লিমিটেডের নামে। অথচ বিটিআরসির আইজিডব্লিউ লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নেই এই প্রতিষ্ঠানের নাম। এমনকি ৬২৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে, যার প্রায় শতভাগ গিয়েছে বেক্সিমকো কম্পিউটারসের অ্যাকাউন্টে, যা সরাসরি সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।
২০২০-২৫ পর্যন্ত বেক্সিমকো কম্পিউটার লিমিটেডের অ্যাকাউন্টে ২৪৯ বার, ডিজিকনের অ্যাকাউন্টে ২৫ বার, গ্লোবাল ভয়েস টেলিকমের অ্যাকাউন্টে ৪২ বার, ইউনিক ইনফোওয়ের অ্যাকাউন্টে ১ বার, বাংলা ট্র্যাক কমিউনিকেশনের অ্যাকাউন্টে ২৫ বার ট্রান্সফার করা হয়।এই অস্বচ্ছতা ও অর্থ স্থানান্তরের ব্যাপারে বিটিআরসি ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এত বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়।
আইজিডব্লিউ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইওএফ উদ্যোগটি বাজারের জন্য ক্ষতিকর হবে দাবি করে টেলিযোগাযোগ খাতের অনেকে আপত্তি জানিয়েছিলেন। সেসময় আমরা (আইজিডব্লিউ উদ্যোক্তা) তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি আবেদন পাঠিয়েছিলাম যাতে এটি প্রতিষ্ঠিত না হয়। সেই আবদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, এটি বাস্তবায়িত হলে একটি বিতর্কিত গোষ্ঠী লাভবান হবে এবং সরকারি কর ফাঁকি দিয়ে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যদিও সে আপত্তির তোয়াক্কা না করেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে প্রস্তাবটি অনুমোদন দেন শেখ হাসিনা।
অপরদিকে, সর্বশেষ কমিশন সভায় বিটিআরসি আইওএফ ও আইজিডব্লিউ অপারেটরদের মধ্যে বিদ্যমান অপারেশনাল চুক্তির অনুমোদন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিগ্গিরই এ বিষয়ে একটি নির্দেশিকা জারি করবে কমিশন। বৈঠকে আন্তর্জাতিক কল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর মধ্যে রয়েছে আইজিডব্লিউ হিসাবে নির্দিষ্ট অপারেটরদের কার্যক্রম পরিচালনা, আন্তঃঅপারেটর সংযোগ স্থাপন এবং কল আদান-প্রদানে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি নতুনভাবে কমন পয়েন্ট নির্ধারণ, নগদায়নযোগ্য ব্যাংক গ্যারান্টি গ্রহণ, একক এমএনপি সার্ভার ব্যবহার করে ডিপিং কার্যক্রম পরিচালনা, আন্তর্জাতিক কল বণ্টনের সমতা নিশ্চিতকরণ এবং কল মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিশনের মতে, এসব পদক্ষেপ দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে এবং অব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব অপচয় রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
** ৬০০ কোটি টাকা লুটে সালমানের সংশ্লিষ্টতা
** টেলিকমেও সালমানের থাবা, লুটেছেন ৬২৫ কোটি
** সালমান ও তার ছেলেসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা
** বেক্সিমকো ফার্মার ২২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ