অগ্রিম জরিমানায় আপিলে দ্বৈত নীতি, ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা

কাস্টমস ট্রাইব্যুনাল

কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালে অগ্রিম জরিমানা দিয়ে মামলা লড়ার ক্ষেত্রে দ্বৈত নীতির অভিযোগ উঠেছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন—একই নিয়মে কেন ভিন্ন আচরণ? এর পেছনে কোনো অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিষয় আছে কি না, সে সন্দেহও প্রকাশ করেছেন তারা। আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যবসায়ী সরকারি আদেশে ক্ষতিগ্রস্ত হলে জরিমানার ১০ শতাংশ অগ্রিম জমা দিয়ে (হার্ডশিপ আবেদন) আপিল মামলা করার সুযোগ পান। তবে বাস্তবে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ইপিজেডে অবস্থিত বিদেশি প্রতিষ্ঠান জিন চ্যাং শুজ লিমিটেড অগ্রিম জরিমানা জমা ছাড়াই আপিল শুনানির সুযোগ পেয়েছে। বিপরীতে, দেশীয় তৈরি পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান মেলো ফ্যাশন লিমিটেড আবেদন করেও সেই সুযোগ পাচ্ছে না। এ বৈষম্যের কারণে মেলো ফ্যাশন লিমিটেড স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে জানা গেছে।

অগ্রিম জরিমানা সংক্রান্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ঢাকার গোল্ডটেক্স গার্মেন্টস লিমিটেডও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও জামিন না পেলেও আপিলের অধিকার পায়, কিন্তু ব্যবসায়ীদের সেই আইনি অধিকার ভোগ করতে জরিমানার ১০ শতাংশ অগ্রিম জমা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে—যা তাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। এদিকে, চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক এবং বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদুল হাসান খান অগ্রিম জরিমানা ছাড়াই হার্ডশিপ আবেদন গ্রহণ করে আপিল শুনানির সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দেন। তবে এ বিষয়ে এখনো ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানিয়েছেন, ‘এসব আসলে হয়রানি। সরকার ব্যবসাবান্ধব, শিল্পায়ন সহজ করার প্রতিশ্রতিতে বড় বাধা। একটি প্রতিষ্ঠানকে যদি আপনি সুযোগ দেন তাহলে আরেকটিকে কেন দেবেন না? চট্টগ্রাম বন্ড কাস্টমসের যে ডেপুটি কমিশনার এই বিপুল জরিমানা করেছেন তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা খতিয়ে দেখা হোক। স্বেচ্ছাচারিতা মিললে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।’এই হয়রানি কমিয়ে ব্যবসাবন্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম চেম্বারের আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকার ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বাজেটে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে স্ট্যাচুটরি ডেপোজিটের পরিমাণ কমিয়ে ১০ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ করেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রামের কদমতলীতে অবস্থিত মেলো ফ্যাশন লিমিটেড একটি রপ্তানিমুখী এসএমই শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের সদস্য। কারখানা পরিদর্শনের পর ২০২৩ সালের ৭ মে চট্টগ্রাম বন্ড কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনারের নেতৃত্বাধীন তদন্ত দল একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২২ মে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির মামলা করে বন্ড কমিশনার। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অর্থদণ্ড, জরিমানা ও শুল্ক-করসহ মোট ১৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করতে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয় মেলো ফ্যাশন লিমিটেড।

বিজিএমইএ’র পরিচালক ও মেলো ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল্লাহ মনসুর বললেন, ‘আমি দোষী সাব্যস্ত না হওয়ার আগেই কেন টাকা জমা দেব। এ ধরনের আইন ও নীতি প্রয়োগ মানে হলো হয়রানি। ব্যবসায়ীদের মনোবল নষ্ট করে দেওয়া। দোষী সাব্যস্ত হলে জরিমানা গুণতে বাধ্য।’