সৌরবিদ্যুৎ, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বিশেষ সুবিধা

বাজেট ২০২৬-২৭

আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখার পরিকল্পনা করছে বিএনপি সরকার। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসব খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, ডিজিটাল অর্থনীতি উৎসাহিত করা এবং গণপরিবহনকে আরও সাশ্রয়ী করতে বাজেটে একাধিক কর ও শুল্ক সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের শুল্ক ও কর ছাড়ের প্রস্তাব রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য আয়কর অব্যাহতি এবং কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের ওপর উৎসে কর প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মেট্রোরেলের ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। জানা গেছে, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর বর্তমান উচ্চ শুল্ক-কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর উদ্যোগ নিতে পারে সরকার। বর্তমানে এসব যন্ত্রাংশে মোট শুল্কভার ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত থাকলেও নতুন বাজেটে তা ১৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বর্তমানে সোলার প্যানেলে মোট শুল্কভার প্রায় ২৭ শতাংশ, ইনভার্টারে প্রায় ২৯ শতাংশ এবং পিভি-ডিজি (সোলার বা ফটোভোলটাইক সিস্টেম ও ডিজেল জেনারেটর) কন্ট্রোলারে প্রায় ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ রয়েছে। এছাড়া ডিসি (ডিরেক্ট কারেন্ট) কেবল, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম, মাউন্টিং স্ট্রাকচারসহ অন্যান্য সহায়ক যন্ত্রাংশেও উচ্চ কর বহাল রয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উপকরণের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর হওয়ায় এই কর কাঠামো প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যেই এসব কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, যেখানে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। তবে শুধু কর ছাড় নয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির শুল্কায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তনেরও দাবি জানিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (বিএসআরইএ) সেক্রেটারি এস এম মুনীর বলেন, ‘শুল্ক কমায় উদ্যোক্তারা খুব বেশি লাভবান হতে পারবেন না। কারণ যে পদ্ধতিতে এসব পণ্যের শুল্কায়ন হয় তা অযৌক্তিক। এখনো প্যানেলসহ বিভিন্ন পণ্যের শুল্কায়ন হয় ওজনের ভিত্তিতে, হওয়া উচিত পিআই ভিত্তিক। ওজন ভিত্তিক হওয়া এসব পণ্যে দ্বিগুণের বেশি শুল্ক দিতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সোলার পণ্যে করভার শূন্য করা গেলে এসব পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাবে। সরকার যখন জ্বালানি দিতে হিমশিম খাচ্ছে তখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিকল্প হতে পারে।’ তবে বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সুবিধা দেওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট বিদ্যা অমৃত খান। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন বাধ্যতামূলক শর্তে পরিণত হয়েছে। কিন্তু উচ্চ শুল্ক-কর সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বড় বাধা।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও ড্যাফোডিল ইটারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ বৈষম্যের শিকার। বিদ্যুতের বাজার অসম। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ডেভেলপ করা হয়নি। বাজার অসম রাখা হয়েছে। সেখানে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজার। এই সেক্টর থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স তুলে দিতে হবে।’ এদিকে আগামী বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ খাতে আয়কর অব্যাহতি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সরকার ২০৩৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৭৬ অনুযায়ী এ সুবিধা আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে পারে। এই সুবিধা পেতে হলে প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি নেট মিটারিং নির্দেশিকা-২০২৫ অনুযায়ী অনুমোদন নিতে হবে এবং বিদ্যুৎ বিক্রির ক্ষেত্রে পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (পিপিএ) অনুসরণ করতে হবে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের জন্যও কর রেয়াতের প্রস্তাব রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করলে পরিশোধিত বিদ্যুৎ বিলের ৫ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থ তাদের প্রদেয় আয়করের বিপরীতে রেয়াত হিসেবে সমন্বয় করা যাবে।

জানা গেছে, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য করছাড় ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণে ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে অর্জিত আয়ের ওপর বিদ্যমান ৭ দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করছে সরকার। বর্তমানে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত এ ধরনের আয়ের ওপর উৎসে কর কাটা হয়। তবে নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী স্বাধীন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সাররা এ কর থেকে অব্যাহতি পাবেন। তবে মিডিয়া হাউস বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুবিধার আওতায় আসবে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবাখাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে ফিন্যান্স বিল ২০২৬-এ এ সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, করছাড় কার্যকর হলে দেশের প্রায় পাঁচ লাখ ফ্রিল্যান্সার এবং দ্রুত সম্প্রসারণশীল ‘ক্রিয়েটর ইকোনমি’ নতুন গতি পাবে। এছাড়া রাজধানীর জনপ্রিয় গণপরিবহন মেট্রোরেলের ভাড়ার ওপর বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার। বর্তমান সুবিধার মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগর পরিবহনে মেট্রোরেলের গুরুত্ব বিবেচনায় এ সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বাণিজ্যিকভাবে চালু হওয়ার পর থেকে মেট্রোরেল রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় গণপরিবহনে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন লাখ যাত্রী এই সেবা ব্যবহার করছেন।

এর আগে নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর ০.৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা জনস্বার্থ বিবেচনায় বাতিল করতে পারে সরকার। পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার কর বাতিল, সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার করের উদ্যোগ প্রত্যাহার এবং রপ্তানি প্রণোদনার ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং দেশের ইতিহাসে অন্যতম উচ্চাভিলাষী বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই সংসদের প্রথম বাজেট অধিবেশন, যেখানে আগামী ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।