কোরবানির ঈদ সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এবারও পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ঘুঘুদহ গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন ঘরে পেঁয়াজ মজুত করেছিলেন। তাঁর আশা ছিল, ঈদের আগে দাম বাড়লে সেই পেঁয়াজ বিক্রি করে গরু কেনা ও পরিবারের জন্য নতুন কাপড় কেনার ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাঁর দুশ্চিন্তা; কারণ বাজারে পেঁয়াজের দাম এখনো এতটাই কম যে উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না।
রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাঁথিয়া উপজেলার কাশিনাথপুর হাটে কথা হয় দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর এই সময় পেঁয়াজের দাম একটু বাড়ে। সেই আশায় ঘরে পেঁয়াজ তুলে রাখছিলাম। কিন্তু আজ হাটে প্রতি মণ ৮০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকার বেশি দাম নাই। ছোট পেঁয়াজ তো ৫০০-৬০০ টাকাতেও বিক্রি করতে হতেছে। এই দামে পেঁয়াজ বেচলে কোরবানি তো দূরের কথা, ধারদেনাও শোধ করা যাবে না। গত বছর পেঁয়াজের ভালো দাম পাইছিলাম, তাই কোরবানি দিছি। কিন্তু এবার বড় ধরনের লোকসান হওয়ায় কোরবানি দিতে পারব না।’
দেলোয়ারের মতো একই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন সাঁথিয়া উপজেলার হাজারো পেঁয়াজচাষি। পেঁয়াজের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত এ উপজেলায় প্রতিবছর পেঁয়াজ বিক্রির অর্থ দিয়েই অনেক কৃষক কোরবানির পশু কেনেন, ঘর মেরামত করেন, পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকাটা করেন। কিন্তু এবার ভালো ফলন হলেও বাজারদর ভেঙে পড়ায় সেই ঈদ অর্থনীতিতে নেমে এসেছে স্থবিরতা। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে পেঁয়াজের ফলন খুব ভালো হয়েছে। অনেক কৃষক প্রতি বিঘায় ৭০ থেকে ৮০ মণ পর্যন্ত দেশি পেঁয়াজ পেয়েছেন। হাইব্রিড জাতের ফলন হয়েছে আরও বেশি। তবে উৎপাদন বাড়লেও বাজারে দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তাঁরা।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় ও কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, এবার প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় দেড় হাজার টাকা। অথচ এখন হাটভেদে ভালো পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা মণ দরে। ছোট পেঁয়াজের দাম আরও কম, ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। সাঁথিয়া উপজেলার চোমরপুর গ্রামের জহিরউদ্দিন বলেন, ‘পেঁয়াজ বিক্রি কইর্যা প্রতিবছর একটা করে গরু কিনত্যাম। এবার মনে হয় ভাগেও কোরবানি দিব্যার পারব না। সংসারের খরচ চালাইতেই কষ্ট হইত্যাছে।’
আজ সকালে সাঁথিয়ার কাশিনাথপুর ও করমজা চতুরহাটে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকেরা বস্তাভর্তি পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে এলেও তাঁদের মুখে স্বস্তি নেই। দাম কম থাকায় অনেকেই পেঁয়াজ বিক্রি না করে আবার বাড়িতে ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তবে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করলে পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার শঙ্কাও বাড়ছে, ইতোমধ্যে অনেকের মজুত পেঁয়াজে পচন ধরতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা। করমজা চতুরহাটের আড়তদার আবদুল মুন্নাফ জানান, এ বছর বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ অনেক বেশি হলেও সেই তুলনায় ক্রেতা কম, ফলে দাম বাড়ছে না এবং কৃষকদের লোকসান গুনে বিক্রি করতে হচ্ছে। সাধারণত কোরবানির ঈদের আগে পেঁয়াজ বিক্রির অর্থে এ অঞ্চলের বাজারে কেনাকাটা বাড়ে—গরুর হাট থেকে কাপড় ও সোনার দোকান পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু এবার সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না।
সাঁথিয়া পৌর এলাকার একটি পোশাকের দোকানের মালিক আনোয়ার হোসেন জানান, অন্য বছরগুলোতে ঈদের আগে গ্রামের কৃষকেরা পরিবারসহ বাজারে ভিড় করতেন, কিন্তু এবার বেচাকেনা তুলনামূলকভাবে কম এবং মানুষ খরচ কমিয়ে দিচ্ছেন। একই চিত্রের কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সোনা ব্যবসায়ীরাও; তাঁদের মতে, প্রতি বছর ঈদের আগে কৃষক পরিবারের গয়না কেনার চাপ থাকলেও এবার সেই ক্রেতা প্রায় নেই বললেই চলে। উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সাঁথিয়ায় ১৬ হাজার ৬৯৭ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে, যার বেশির ভাগই হালি পদ্ধতির। মোট উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৯০ হাজার ২৯৯ টন, যার মধ্যে এখনো কৃষকের ঘরে মজুত রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টন পেঁয়াজ। ভালো ফলনের কারণে বাজারে সরবরাহ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সাঁথিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জুনায়েদ আল সাদি বলেন, এবার পেঁয়াজের ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে গেছে। কৃষকেরা যাতে সংরক্ষণ করে পরে ভালো দামে বিক্রি করতে পারেন, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে কৃষকেরা বলছেন, শুধু সংরক্ষণের পরামর্শে তাঁদের সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ, ঋণ, শ্রমিকের মজুরি এবং সংসার ও ঈদের খরচ মেটাতে তাঁদের এখনই টাকা দরকার। তাই লোকসান জেনেও বাধ্য হয়ে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে।
