দুই বছরের বেশি শূন্য পদ বিলুপ্তির নির্দেশ

যৌক্তিক কারণ ছাড়া কোনো শূন্য পদে টানা দুই বছরের বেশি সময় নিয়োগ সম্পন্ন না হলে তা বিলুপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সব মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিবদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ৭ এপ্রিল সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের সমন্বয় সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর আগে সরকার ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ লাখ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেয়, যার আওতায় প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগ দেবে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রম সমন্বয় করবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

সচিবদের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, কোনো সৃজিত পদ টানা দুই বছরের বেশি সময় শূন্য থাকলে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে সেটিকে বিলুপ্তির প্রক্রিয়ায় নিতে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে উদ্যোগ নিতে হবে। এ ধরনের পদ অযথা সংরক্ষণ না করে বাস্তব প্রয়োজন ও জনবল ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা বিবেচনায় তাদের যৌক্তিকতা পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, শূন্য পদের প্রকৃত প্রয়োজন আছে কি না এবং তা বিলুপ্ত হলে সাংগঠনিক কাঠামোয় কোনো সমস্যা তৈরি হবে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। তিনি আরও জানান, অনেক দপ্তর-সংস্থায় পদ সৃষ্টি হলেও নিয়োগবিধি প্রণয়ন হয়নি, আর বিধি-প্রবিধিমালা সংশোধনেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘ সময় লাগে। দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিধি-প্রবিধিমালা তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে সংশোধন এবং প্রয়োজনে সরকারের একটি বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘স্ট্যাটিসটিকস অব পাবলিক সার্ভেন্টস-২০২৪’ অনুযায়ী, সব শ্রেণি মিলিয়ে বর্তমানে ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন সরকারি চাকরিজীবী কর্মরত আছেন। এর বিপরীতে শূন্য আছে চার লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদ। বর্তমানে সরকারি চাকরির প্রথম শ্রেণিতে কর্মরত আছেন এক লাখ ৯০ হাজার ৭৭৩ জন, এর মধ্যে শূন্য পদ ৬৮ হাজার ৮৮৪টি। দ্বিতীয় শ্রেণিতে কর্মরত দুই লাখ ৩৩ হাজার ৭২৬ জন, শূন্য এক লাখ ২৯ হাজার ১৬৬টি পদ। তৃতীয় শ্রেণিতে কর্মরত ছয় লাখ ১৩ হাজার ৮৩৫ জন, শূন্য এক লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি পদ। চতুর্থ শ্রেণিতে কর্মরত চার লাখ চার হাজার ৫৭৭ জন, শূন্য এক লাখ ১৫ হাজার ২৩৫টি পদ।

এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে মোট পদের প্রায় ৩২ শতাংশই শূন্য রয়েছে, যার সংখ্যা ৭৭ হাজার ৮৭৭। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সংসদে জানিয়েছেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, বিভিন্ন দপ্তরে শূন্য পদের সংখ্যা নির্ধারণে তথ্য সংগ্রহ চলছে; সব তথ্য পাওয়ার পর নিয়োগ ও পদ বিলুপ্তি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। তিনি আরও বলেন, নিয়োগের জন্য বাজেট প্রয়োজন, যা নতুন অর্থবছরে পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে; এরপর আগামী জুলাই থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক সচিব বলেন, শূন্য পদের বিষয়ে সব দপ্তর/সংস্থার প্রধানদের ডেকে বৈঠক করা হয়েছে। পিএসসির চেয়ারম্যানের সঙ্গেও দুই দফা বৈঠক করেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা। এদিকে, পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম বলেন, শূন্য পদে নিয়োগের বিষয়ে কয়েকজন মন্ত্রী তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। আমরা বিস্তারিত পরিকল্পনা জানিয়েছি। তবে কোন পদে কতজন নিয়োগ হবে, তা নথি দেখে বলতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিবছর একটি বিসিএস সম্পন্ন করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে পিএসসি। এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিশেষ কোনো বিসিএস বা নিয়োগের উদ্যোগ নিলে সেই কাজ করার চেষ্টা করব।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় পাঁচ লক্ষাধিক পদ শূন্য রয়েছে এবং দ্রুত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্য ও মেধাবীদের এসব পদে নিয়োগ দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও নিয়োগ কার্যক্রমের গতি এখনো ধীর। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের চার থেকে পাঁচ বছর পরও প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে না, ফলে রাজস্ব খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। একই সঙ্গে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার এবার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

খরচ লাগবে সাড়ে ৮ কোটি টাকা

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের বাজেট শাখার কর্মকর্তারা বলেন, পাঁচ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রমে প্রয়োজন হবে সাড়ে আট কোটি টাকা। এ জন্য আগামী অর্থবছরে অর্থ বরাদ্দ রাখা হবে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ কত সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করতে পারবে, সে ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে পাঁচ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের চেষ্টা চলছে।