ছোট করদাতা ১২০ দিনে, কোম্পানি ৬০ দিনে রিফান্ড পাবেন

বাজেট ২০২৬-২৭

** রিফান্ড হবে ফেসলেস, করদাতাকে কর অফিসে আসতে হবে না, দেখা হবে না কর্মকর্তার সঙ্গে
** বেতন, কৃষি ও আর্থিক পরিবহন-এই তিন খাতের ব্যক্তি করদাতারা সহজে রিফান্ড পাবেন
** ১ টাকা থেকে শত কোটি টাকা-রিটার্নে রিফান্ড অংশে আবেদন করলে করদাতার ব্যাংক হিসাবে চলে যাবে

আপনি একজন করদাতা। অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করলেন। রিটার্ন দিতে গিয়ে দেখলেন, আপনার যা ট্যাক্স হয়, তার মধ্যে এক টাকা বাড়তি সরকারি কোষাগারে জমা হয়ে গেছে। যদি এই এক টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে রিফান্ড পান, কেমন লাগবে? অথবা আপনার কোটি টাকা রিফান্ড হলো। সেটা যদি কর অফিসে না গিয়ে, কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা না করে সরাসরি আপনার ব্যাংক হিসাবে পেয়ে যান, কেমন লাগবে? নিশ্চয়, ভালো লাগবে। হ্যাঁ, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিফান্ড সিস্টেম চালু করার পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কর কর্মকর্তারা বলছেন, এক টাকা থেকে শত কোটি টাকা-পুরো রিফান্ড হবে অনলাইন ও ক্যাশলেস। শুধু ক্যাশলেস নয়, হবে ফেসলেস। অর্থাৎ করদাতার সঙ্গে কর কর্মকর্তাদের দেখা হবে না। এতে হাজার হাজার ব্যক্তিশ্রেণির করদাতা সহজে রিফান্ড পেয়ে যাবে। সহজে রিফান্ড পেলে করদাতা কর দিতে উৎসাহ পাবেন। শুধু ব্যক্তি করদাতা নয়, কোম্পানি করদাতাদের জন্যও একইভাবে অনলাইনে রিফান্ড সিস্টেম চালু করা হচ্ছে। এর ফলে রিফান্ড নিয়ে এতদিনের অভিযোগের সুরাহা হবে, ব্যবসার গতি বাড়বে। অনলাইন ও ক্যাশলেস রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করায় করদাতাদের ভোগান্তি কমবে, উৎসাহ বাড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাজেট সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আয়কর রিফান্ড বা কর ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও গতিশীল করতে এনবিআর বড় ধরনের সংস্কার আনছে। করদাতাদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করতে এবার আইনি বাধ্যবাধকতা এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। রিফান্ড নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। ছোট করদাতারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রিফান্ড পান না। হার্ডকপি বা ম্যানুয়াল রিটার্ন দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি কোষাগারে অতিরিক্ত জমা দেওয়া কর পরবর্তী করবর্ষে করদাতারা অ্যাডজাস্ট করতে পারতেন। সেক্ষেত্রে ছোট অ্যামাউন্ট হলে বেশিরভাগ করদাতা অ্যাডজাস্ট এর সুযোগ পেতেন না বা করদাতা ইচ্ছে করে তা অ্যাডজাস্ট করতেন না। তবে অনলাইন রিটার্ন বা ই-রিটার্ন চালু হওয়ার পর করদাতারা আরো বেকায়দায় পড়েছেন। ছোট করদাতা, বিশেষ করে যাদের বেতন, কৃষিসহ অন্যান্য খাত থেকে আয়-তাদের রিফান্ড হলে তা অনলাইনে নেয়া সম্ভব হতো না। করদাতাদের উৎসাহ দিতে আগামী অর্থবছর বাজেটে এই রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক টাকা থেকে শত কোটি টাকা-যা রিফান্ড হবে, অনলাইন রিটার্নে দেওয়া সব তথ্য ঠিক থাকলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা তা সহজে পেয়ে যাবেন। করদাতা রিটার্ন পূরণ করার সময় অতিরিক্ত জমা দেওয়া কর রিফান্ড নেবেন, নাকি অ্যাডজাস্ট করবেন-তা দেখাবে। সেখানে রিফান্ড সিলেক্ট করে ব্যাংকের সব তথ্য দিয়ে আবেদন করবেন। সব ঠিক থাকলে ১২০ দিনের মধ্যে করদাতার দেওয়া ব্যাংকে রিফান্ডের টাকা চলে যাবে। প্রাথমিকভাবে বেতন, কৃষি ও আর্থিক পরিবহন-এই তিন খাতের করদাতারা এই রিফান্ড পেয়ে যাবেন। অর্থাৎ করদাতার রিফান্ড আবেদন জমা পড়ার পর তা যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তির জন্য সর্বোচ্চ ১২০ দিন সময় পাবেন কর কর্মকর্তারা। মোট করদাতার অন্তত ৯০ শতাংশ এই তিন খাতের বলে মনে করেন কর্মকর্তারা।

কর্মকর্তারা আরো জানিয়েছেন, বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। আগামী অর্থবছর থেকে কোম্পানি করদাতাদের জন্য অনলাইন বা ই-রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। কোম্পানি করদাতাদের রিফান্ড জটিলতা দীর্ঘদিনের। কোম্পানিগুলোর শত শত কোটি টাকা রিফান্ড হলেও তা সঠিক সময়ে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কোম্পানি করদাতাদের অ্যাসেসমেন্ট বা নিরীক্ষা জটিলতা, কাগজপত্রের ঘাটতি, ভুয়া রিপোর্ট-ইত্যাদির কারণে রিফান্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়। সরকারের কাছে কোম্পানির শত শত কোটি টাকা পড়ে থাকায় ব্যবসার ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়ে। আগামী অর্থবছর থেকে অনলাইনে রিফান্ড দাখিলের পাশাপাশি রিফান্ডের আবেদনও করা যাবে। আবেদন করার ৬০ দিনের মধ্যে তা কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে চলে যাবে। তবে কোম্পানি করদাতাদের রিটার্ন অ্যাসেসমেন্ট হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে রিফান্ড পাবেন। কোম্পানি করদাতাদের ক্ষেত্রেও রিফান্ড ১ টাকা শত কোটি টাকা হলেও কোন সমস্যা নেই। অ্যাসেসমেন্ট শেষ হলে, কাগজপত্র ঠিক থাকলে, ব্যাংক হিসাবের তথ্য ঠিক দেওয়া থাকলে-সরাসরি কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে রিফান্ডের টাকা চলে যাবে। এক্ষেত্রেও কোম্পানির প্রতিনিধি বা লোকজন কর অফিসে আসতে হবে না। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি হবে ফেসলেস।

এই বিষয়ে সাবেক কর কমিশনার মো. বজলুল কবির ভূঁঞা বলেন, রিফান্ড যতো দ্রুত ও সহজতর হবে, মানুষ ততো কর দিতে উৎসাহ পাবেন। সারা বিশ্বে রিফান্ড হলো করদাতার অধিকার। আর ট্যাক্স হলো সরকারের অধিকার। ট্যাক্সের অতিরিক্ত কর বা শুল্ক-যেটা দেয়া হয়, এটা যত দ্রুত বা চাহিবামাত্র ফেরত দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রের কর্তব্য। এই অধিকার থেকে করদাতাকে যত বঞ্চিত করা হবে, রাষ্ট্র তত পিছিয়ে যাবে এবং মানুষ কর দিতে উৎসাহ পাবেন না।

অনলাইন রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করায় সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, এই সিদ্ধান্ত দ্রুত সময়ে অটোমেশনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হোক। বা অ্যাপসের মাধ্যমে অটোমেটিক্যালি করদাতার কাছে চলে যাবে। এটা বাস্তবায়ন হলে এনবিআর করদাতাদের উপর অনেক অধিকার খাটাতে পারবে। কারণ করদাতা যে ট্যাক্স দিচ্ছেন, তা এনবিআর দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফেরত দিচ্ছেন। রিফান্ড বিলম্বিত হওয়ায় বা অনেক করদাতা রিফান্ড পায়নি বলে পথে বসে গেছেন এবং তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। সরকার সব সময় রিফান্ড না দেওয়ার পক্ষে ছিলো। আমি কর্মরত থাকাবস্থায়ও বলতাম, রিফান্ড আমাদের লাইবেলিটি, যা শেষ করতে হবে। যত দ্রুত রিফান্ড দেওয়া যাবে, তত দ্রুত ডিমান্ড আদায় করা যাবে।

যেভাবে রিফান্ড পাবেন

একজন করদাতার পরিশোধিত অগ্রিম কর বা উৎসে কর যদি প্রকৃত প্রদেয় করের চেয়ে বেশি হয়, তবে রিফান্ড দাবির জন্য করদাতাকে অনলাইনে রিটার্ন পূরণ করার ক্ষেত্রে আবেদন করতে হবে। যেমন- করদাতাকে অনলাইনে নির্ভুলভাবে আয়ের সঠিক বিবরণী এবং বছরজুড়ে কেটে নেওয়া উৎসে কর বা অগ্রিম করের তথ্য সঠিকভাবে ইনপুট দিতে হবে। করদাতার ব্যাংক হিসাবের নাম, নম্বর এবং রাউটিং নম্বর শতভাগ নির্ভুলভাবে উল্লেখ করতে হবে। যেহেতু টাকা সরাসরি ব্যাংকে যাবে, তাই এই তথ্যে ভুল হলে রিফান্ড আটকে যাবে। অনলাইনে রিটার্ন পূরণের পর সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব করে দেখাবে যে করদাতার কোনো রিফান্ড বা ফেরতযোগ্য টাকা তৈরি হয়েছে কি না। রিফান্ডযোগ্য অ্যামাউন্ট থাকলে তা ট্যাক্স সার্টিফিকেটে দৃশ্যমান হবে। করদাতা তখন বাড়তি পরিশোধ কর সমন্বয় বা ফেরতের (রিফান্ড) আবেদন করতে পারবেন। অর্থাৎ করদাতা চাইলে সরকারি কোষাগারে জমা হওয়া বাড়তি কর আগামী করবছরের প্রদেয় করের সাথে অ্যাডজাস্ট করে রাখতে পারবেন। আর টাকা সরাসরি হাতে পেতে চাইলে রিটার্নের সাথে রিফান্ডের জন্য আলাদা আবেদন অপশনে ক্লিক করে সেখানে ব্যাংক হিসাবের তথ্য দিতে হবে।