** মাত্র তিনমাস আগে বন্ড লাইসেন্স পেয়ে কাপড় আমদানি করে-ই খোলাবাজারে বিক্রি শুরু করে প্রতিষ্ঠান
** তিনমাস ৭ দিনে ৬৫৯ টন কাপড় আমদানি করে ৪০৭ টন-ই খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে
** মোট ৯৭ দিনে ৬৫৯ টন কাপড় আমদানি হয়েছে, গড়ে প্রতিদিন গড়ে ৭ টন কাপড় আমদানি হয়েছে
** বন্ড কমিশনারেটকে বোকা বানাতে ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন চালু রেখেছে, কিন্তু নিজস্ব কোন উৎপাদন নেই, অন্য প্রতিষ্ঠানের কাপড় সাব-কন্ট্রাক্টে নিয়ে পণ্য তৈরি করছে
** ২৩৮ মেট্রিক টন কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি দেখানো হয়েছে, যদিও স্টক লটের কাগজ দিয়ে ভুয়া রপ্তানি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে
নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বন্ড লাইসেন্স পেয়েছে মাত্র তিনমাস ৭ দিন আগে। লাইসেন্স পেয়ে যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছে। যাতে ঘষা দেয়ার পর বন্ডের কাপড় বের হয়, আর প্রতিষ্ঠান চোরাই পথে খোলাবাজারে বিক্রি দিয়েছে। আলাদিনের চেরাগ বা বন্ড লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি লাইসেন্স পেয়ে-ই তিনমাস সাতদিন বা ৯৭ দিনে বন্ড বা শুল্কমুক্ত সুবিধা কাপড় আমদানি করেছে ৬৫৯ মেট্রিক টন। যার মধ্যে ৪০৭ মেট্রিক টন কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। বন্ড যেন অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে হরিলুটের কারখানায় পরিণত হয়েছে। আর এই হরিলুটে নাম লিখিছে চট্টগ্রামের আকবর শাহ এলাকার মেসার্স এএমটি ফ্যাশন বিডি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। শুধু বন্ডের কাপড় বিক্রি করে প্রতিষ্ঠান ক্ষান্ত হয়নি, বন্ড কর্মকর্তাদের বোকা বানাতেও চেষ্টা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজের আমদানি করা সব কাপড় বিক্রি করে দিয়েছে। কয়েকটি মেশিন চালু রেখে তাতে অন্য প্রতিষ্ঠানের কাপড় দিয়ে সাব-কন্ট্রাক্টে পণ্য উৎপাদন করছে, যাতে বন্ড কর্মকর্তারা বুঝতে না পারেন। শেষ রক্ষা হয়নি, প্রতিষ্ঠানের দুইমাসের ৬৫৯ মেট্রিক টন আমদানি করা কাপড়ের ৪০৭ মেট্রিক টন কাপড় বিক্রির প্রমাণ পেয়েছেন কর্মকর্তারা। বিক্রি করা কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য প্রায় ২২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, যার মধ্যে প্রযোজ্য শুল্ককর প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা প্রতিষ্ঠান ফাঁকি দিয়েছেন। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ধরনের নামসর্বস প্রতিষ্ঠান কিভাবে লাইসেন্স পেলো, তা খতিয়ে দেখা দরকার। লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া আরো কঠিন করা উচিত। এই ধরনের কিছু অসাধু বন্ড প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এএমটি ফ্যাশন কিভাবে বন্দর ও কাস্টমস থেকে বন্ড সুবিধার এত বিপুল পরিমাণ কাপড় খালাস করলো, কারা জড়িত-তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্রমতে, ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঈঁশা মহাজন রোড, উত্তর কাট্টলি আকবর শাহ চট্টগ্রাম এলাকার মেসার্স এএমটি ফ্যাশন বিডি নামের প্রতিষ্ঠানকে শতভাগ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে বন্ড লাইসেন্স দেয় চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। লাইসেন্স পাওয়ার পরপরই প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় বিপুল পরিমাণ কাপড় আমদানি শুরু করে। আমদানি করা এই কাপড় দিয়ে প্রতিষ্ঠান কোন পণ্য তৈরি করেনি, এমনকি কোন রপ্তানিও করেনি। প্রতিষ্ঠানটির বন্ড সুবিধার কাপড় খোলাবাজারে বিক্রির তথ্য পায় চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। এরই প্রেক্ষিতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযানের জন্য সাত সদস্যের একটি নিবারক দল গঠন করা হয়। নিবারক দলের সদস্যরা চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি অর্থাৎ নতুন বন্ড লাইসেন্স দেওয়ার প্রায় তিনমাস পর প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান পরিচালনা করেন। বন্ড কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক অনিয়ম দেখতে পান।
সূত্র আরো জানায়, বন্ড কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানের বন্ড গুদাম পরিদর্শন করেন। এসময় কাঁচামালের ইন-টু-বন্ড রেজিস্টার দেখতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং পার্টনার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন জানান, তারা এই রেজিস্টার ব্যবহার করেন না। এছাড়া প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল মজুদ সংক্রান্ত রেজিস্টারও দেখাতে পারেনি। অর্থাৎ এই দুই ধরনের রেজিস্টার না থাকার অর্থ হলো প্রতিষ্ঠান যে পরিমাণ কাপড় আমদানি করেছে, তা বন্ড গুদামে প্রবেশ করেনি। বন্দর থেকে খালাস করার পর সরাসরি তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। আর বন্ড গুদামে আমদানি করা কোন কাঁচামাল বা কাপড় প্রতিষ্ঠান দেখাতে পারেনি। এছাড়া রপ্তানির কোন কাগজও দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠান।
অপরদিকে, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বন্ড কর্মকর্তাদের বোকা বানাতে অভিনব কায়দা অবলম্বন করেন। অভিযানে বন্ড কর্মকর্তারা কয়েকটি মেশিনে ২০-২৫ জন শ্রমিককে বিভিন্ন ধরনের পোশাক তৈরি করতে দেখেন। প্রথমে বন্ড কর্মকর্তারা ভেবেছিলেন যে, প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি হচ্ছে, যা রপ্তানি হবে। পরবর্তীতে কর্মকর্তারা ভুল ভাঙ্গে। কর্মকর্তারা দেখতে পান, প্রতিষ্ঠান যে ধরনের কাপড় আমদানি করেছে, সেই কাপড় দিয়ে শ্রমিকরা পোশাক তৈরি করছেন না। অন্য কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করা হচ্ছে। পরক্ষণে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেন যে, তারা অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করছেন। বন্ড কর্মকর্তারা কাটিং সেকশনে ২৩১ কেজি কাপড় (৯৫ শতাংশ পলিস্টার, ৫ শতাংশ স্প্যানডেক্স), সুইং সেকশনে একই ধরনের ৩৫৭ কেজি কাপড়সহ দুই সেকশনে মোট ৩ হাজার ৭৫ কেজি কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করা হচ্ছে।
বন্ড কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির ২০ অক্টোবর অর্থাৎ লাইসেন্স পাওয়ার দিন থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত (৩ মাস ৭ দিন) এর আমদানি তথ্য যাচাই করেন। এতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি এই ৩ মাস ৭ দিন বা ৯৭ দিনে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ৭৯৩ দশমিক ৬০ কেজি বা ৬৫৯ দশমিক ৭৯ মেট্রিক টন কাপড় (ওভেন ফেব্রিক্স) আমদানি করেছে। সে হিসেবে প্রতিদিন গড়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৭ টন কাপড় বন্ড সুবিধায় আমদানি করেছে। এর মধ্যে ২ লাখ ৩৮ হাজার ২০১ কেজি বা ২৩৮ মেট্রিক টন কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করেছে বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠান। তবে এই রপ্তানিও ভুয়া বলে কর্মকর্তাদের দাবি। কারণ, স্টক লটের কাগজ থেকে ভুয়া রপ্তানি দেখানো হয়েছে। রপ্তানি করা কাপড়ের সঙ্গে অপচয় (প্রায় ১৪১ মেট্রিক টন অপচয় ধরা হয়েছে, যদিও এই কাপড়ও প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিয়েছে) যোগ করলে বাকি ৪ লাখ ৭ হাজার ৭৯৫ কেজি বা ৪০৭ দশমিক ৮০ মেট্রিক টন কাপড় প্রতিষ্ঠানে থাকার কথা, যা বন্ড গুদামে পাওয়া যায়। খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া ৪০৭ দশমিক ৮০ মেট্রিক টন কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ২২ কোটি ৯৭ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৯ টাকা, যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ১৭ কোটি ৮০ লাখ ১৭ হাজার ১৮৭ টাকা, যা প্রতিষ্ঠান কাপড় বিক্রির মাধ্যমে ফাঁকি দিয়েছে। বন্ডের কাপড় অবৈধভাবে অপসারণ করে খোলাবাজারে বিক্রি করায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সম্প্রতি মামলা করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। একইসঙ্গে ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব আদায়ে দাবিনামা সম্বলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা বিজনেস বার্তাকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি বেশিরভাগ কাপড়-ই বিক্রি করে দিয়েছে। যে রপ্তানি দেখিয়েছে, তাতেও সন্দেহ রয়েছে। আমরা রপ্তানিও খতিয়ে দেখবো। কিন্তু মাত্র তিনমাস আগে লাইসেন্স পাওয়া প্রতিষ্ঠান এই ধরনের অপকর্ম করবে, সব কাপড় বিক্রি করে দেবে আশা করা যায় না। দাবিনামা জারি করা হয়েছে।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে এএমটি ফ্যাশন বিডির ম্যানেজিং পার্টনার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন খোলাবাজারে বন্ড সুবিধার কাপড় বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেন। ৪০৭ মেট্রিক টন কাপড় বিক্রির বিষয়ে তিনি বিজনেস বার্তাকে বলেন, ‘না না, বিক্রির প্রশ্নই আসে না। আমরা উৎপাদন করেছি, রপ্তানি করেছি।’ এই কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করার স্বপক্ষে কোন কাগজপত্রও পায়নি কর্মকর্তারা-এই বিষয়ে বলেন, ‘কাগজপত্র তো আমাদের কর্মাশিয়ালের কাছে থাকে।’ রপ্তানি করা হলে তার প্রমাণ তো অ্যাসাইকুডাতে থাকে, আপনাদের তা পায়নি-এমন প্রশ্নে মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন বলেন, ‘কেন পাবে না, পাওয়ার তো কথা।’ কারণ দর্শানো নোটিশের বিষয়ে বলেন, ‘নোটিশ এখনো আসেনি, আসবে।’
এই বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়ার পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ী, যারা গার্মেন্টের সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন কেবল বন্ডের অপকর্ম করার জন্য। বন্ডের অপব্যবহার কারা করেন, কাস্টমসের লোকজন জানেন। যারা বন্ডের অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তাদের দুই-একজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এনবিআর কেন দিচ্ছে না? এনবিআর দুই, একজনকে ধরে জনসম্মুখে, পত্রিকায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে তাকে হেনস্তা করা হোক। বন্ডের এই কিছু সংখ্যক চোরের দায় আমরা নিতে চাচ্ছি না। আর বন্ডের কাপড় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত এই অপবাদ আমরা শুনতে চাই না। আমরা চাই, এনবিআর এদের যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করুক। যাতে অন্যরা সাবধান হয়ে যায়।’
