** ফোকাসের ভুয়া রপ্তানি ঠেকাতে সব কাস্টম হাউসের কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে
** ফোকাসের ভুয়া রপ্তানি ঠেকাতে রপ্তানির চালান শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করতে কমিশনারকে বলা হয়েছে
** এফওসির কাপড় আমদানি হয়েছে চীন থেকে, ভুয়া রপ্তানি দেখাতে রপ্তানি দেখানো হয়েছে অন্য দেশে
** এক দেশের বায়ার অন্য দেশের নটিফাই পার্টি দেখিয়ে ভুয়া সেলস কন্ট্রাক বানানো হয়েছে
** রাজধানীর ইসলামপুরের পাটিদের দিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে টিটি এনে ভুয়া রপ্তানি দেখিয়েছে
** ভুয়া রপ্তানি দেখানো হলেও বন্ড কর্মকর্তারা যাচাই না করেই টাকা নিয়ে অডিট শেষ করেছে
** সাব-কন্ট্রাক্ট জালিয়াতি, সব কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি, ধরা খেয়ে কার্টিং তদারকি বন্ধ
** প্রতিষ্ঠানের এফওসি ও এলসিতে আমদানি করা ৮০ শতাংশ কাপড় ইসলামপুরে বিক্রি করে দিয়েছে
** ২০% রপ্তানি হয়েছে কটন, টুয়েল ও জার্সি কাপড়, বাকি সব ঢাকা ইসলামপুরে চলে গেছে
এফওসি (ফ্রি অব কস্ট) ও এলসিতে আমদানি হয়েছে বন্ড সুবিধার ৮০ শতাংশ কাপড়। সেই কাপড় সরাসরি বিক্রি হয়েছে ইসলামপুরে। আর শুল্ককর ফাঁকি ঢাকতে দেখানো হয়েছে ভুয়া রপ্তানি। ভুয়া রপ্তানি জায়েজ করতে এক দেশ থেকে আমদানি হলেও রপ্তানি দেখানো হয়েছে অন্য দেশে। এক দেশের বায়ার অন্য দেশের নটিফাই পার্টি দেখিয়ে ভুয়া সেলস কন্ট্রাক্ট বানানো হয়েছে। আর ইসলামপুরের পার্টি দিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে টিটি এনে ভুয়া রপ্তানি দেখানো হয়েছে। কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে ভুয়া সাব-কন্ট্রাক্ট বানানো হয়েছে। আর ভুয়া রপ্তানিকে জায়েজ করতে অসাধু কিছু বন্ড কর্মকর্তার সহায়তায় অডিটও শেষ করা হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৭৯০ টন পলিস্টার ফেব্রিক্সস বা বোরকার কাপড় আমদানি করে সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করেছে। চট্টগ্রামের ফোকাস অ্যাপারেলস বিডি লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার কাপড় আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রি ও ভুয়া রপ্তানি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানটির জালিয়াতির প্রমাণও পেয়েছে। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
পাঁচ বছরে ৫ হাজার ৮৪৪ মেট্রিক টন আমদানি, বেশিরভাগ-ই বিক্রি
ফোকাস অ্যাপারেলসের আমদানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ২৪৪ কেজি বা ৫ হাজার ৮৪৪ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে। যার আমদানি মূল্য ২৭৭ কোটি ৯৭ লাখ ৩ হাজার ৭১ টাকা। যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ১৯১ কোটি ৫৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫৮ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি ২২৭টি চালানে এক হাজার ১০১ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে। যার মধ্যে বেশিরভাগ-ই পলিস্টার ফেব্রিক্সস বা বোরকার কাপড়, বা ইসলামপুরের কাপড় হিসেবে পরিচিত। কখনো আবার পলিস্টার প্রিন্টেড ফেব্রিক্সস, পলিস্টার, কখনো স্যানডেক্স ইত্যাদি নাম দিয়ে একই কাপড় বন্ড সুবিধায় আমদানি করে বিক্রি করে দিয়েছে। ২০২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ ২৩০টি চালানে এক হাজার ৪৬৫ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মে মাসে ৩ লাখ ৭ হাজার ১৬৩ কেজি, আগস্টে ২ লাখ ৯০ হাজার ৪৫৫ কেজি ও এপ্রিলে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯৪ কেজি কাপড় আমদানি করেছে। এছাড়া জানুয়ারি মাসে ১ হাজার ৯৩৬ কেজি, ফেব্রুয়ারি ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫০৩ কেজি, জুন মাসে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৬ কেজি, জুলাই মাসে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯৩২ কেজি ও সেপ্টেম্বর মাসে ৪২ হাজার ৭৮৮ কেজি কাপড় আমদানি করেছে। অপরদিকে, ২০২৪ সালে ১৪৬টি চালানে এক হাজার ৮৬ মেট্রিক টন, ২০২৩ সালে ৯০টি চালানে এক হাজার ১৩৯ মেট্রিক টন, ২০২২ সালে ২৪টি চালানে ২৬৪ মেট্রিক টন ও ২০২১ সালে ২৯টি চালানে ৩৫৭ মেট্রিক টন কাপড় বন্ড সুবিধায় আমদানি করা হয়েছে।
বিশ্লেষণ করে আরো দেখা গেছে, ২০২২ সালের পর প্রতিষ্ঠানটির আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে ২৯ চালানে ৩.৫৮ লাখ কেজি থেকে ২০২৩ সালে ৯০ চালানে ১১.৪০ লাখ কেজিতে ওঠেছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে চালান সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যায়। ২০২৪ সালে ১৪৬টি এবং ২০২৫ সালে ২২৭টি চালান কাপড় আমদানি করা হয়েছে—অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় ৮ গুণ চালান বৃদ্ধি পেয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে আমদানি মূল্য সর্বোচ্চ ছিল। ২০২৫ সালে আমদানি করা কাপড়ের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ছিলো প্রায় ৬১ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যেখানে ২০২১ সালে ছিল ১০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই আমদানি আরও বেড়েছে। চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৩০টি চালানে ১৪.৬৬ লাখ কেজি কাপড় আমদানি করা হয়েছে—যা ২০২১ থেকে ২০২৫-এর যেকোনো একক বছরের চেয়ে বেশি। পাঁচ বছরে প্রতি চালানে গড় আমদানি প্রায় ৭ হাজার ৬৫৩ কেজি কাপড়।
৫২ লাখ কেজি রপ্তানি, এফওসির কাপড় আমদানি এক দেশ থেকে, রপ্তানি অন্য দেশে, ভুয়া রপ্তানি!
অপরদিকে, রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণে চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসে। প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা কাপড় দিয়ে ৫২ লাখ ১৩ হাজার ৯৫০ কেজি বা ৫ হাজার ২১৩ মেট্রিক টন পোশাক তৈরি করে রপ্তানি দেখানো হয়েছে, যা মূলত কাগজে কলমে। এফওসিতে কাপড় এসেছে চীন থেকে, রপ্তানি দেখানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লেবানন, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন। কিভাবে সম্ভব? আর আমদানি হয়েছে বেশিরভাগ পলিস্টার ফেব্রিক্সস বা বোরকার কাপড়। কিন্তু রপ্তানি দেখানো হয়েছে ছেলেদের প্যান্ট, মেয়েদের লং ড্রেস, বয়েস জিপার, টি-শার্ট, বক্সার, মেয়েদের ড্রেস, জ্যাকেট ইত্যাদি। তবে ভুয়া রপ্তানি কিভাবে দেখানো হয়েছে, ভুয়া রপ্তানির কাগজ দিয়ে কিভাবে অডিট করা হয়েছে- তা নিয়ে কাজ করছে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সব কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে প্রতিষ্ঠান স্টক লটের কাগজ দিয়ে ভুয়া রপ্তানি দেখিয়েছে। এই ভুয়া রপ্তানির সঙ্গে অফ-ডকের কিছু কর্মকর্তা ও কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারে। এক দেশের বায়ার অন্য দেশের নটিফাই পার্টি দেখিয়ে ভুয়া সেলস কন্ট্রাক বানিয়েছে প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর ইসলামপুরের পাটিদের দিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে টিটি এনে ভুয়া রপ্তানি দেখানো হয়েছে।
বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফোকাসের ভুয়া রপ্তানি ঠেকাতে সব কাস্টম হাউসের কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ২০১৬ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠান ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে আসছে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের যেকোন রপ্তানির চালান শতভাগ কায়িক পরীক্ষা ও আমদানি করা কাপড় দিয়ে রপ্তানি হয়েছে কিনা-তা আড়াআড়ি যাচাই করে রপ্তানি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এই চিঠি দেওয়ার পর থেকে ফোকাসের রপ্তানি বন্ধ রয়েছে, অর্থাৎ ভুয়া রপ্তানি দেখাতে পারছে না বলে জানা গেছে। এছাড়া ভুয়া রপ্তানি দেখানো হলেও বন্ড কর্মকর্তারা যাচাই না করেই টাকা নিয়ে অডিট শেষ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাব-কন্ট্রাক্ট জালিয়াতি, সব কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি, ধরা খেয়ে কার্টিং তদারকি বন্ধ
সূত্রমতে, বন্ডের কাপড় খোলাবাজারে বিক্রিতে ফোকাস যেন চ্যাম্পিয়ান। সরাসরি বিক্রি করে দেখায় সাব-কন্ট্রাক্ট। কিন্তু এবার বাঁচতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছরের ১৪ জুলাই ১৯ হাজার ৫০ কেজি কাপড়ের একটি চালান আমদানি করে। বন্ড কমিশনারেট তথ্য পায় যে, প্রতিষ্ঠান এই কাপড় সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। ২১ জুলাই বন্ড কমিশনারেটের একটি দল প্রতিষ্ঠানের বন্ড গুদামে অভিযান পরিচালনা করেন। যাতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি আল ইয়াসরা টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে জাল সাব-কন্ট্রাক্ট ব্যবহার করে এফওসি সুবিধায় আমদানি করা প্রায় ১৯ টন কাপড় কারখানা থেকে অবৈধভাবে সরিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। যাতে প্রযোজ্য শুল্ককর ৬৯ লাখ ২৪ হাজার ৮৪৭ টাকা। বন্ডের কাপড় অবৈধভাবে অপসারণ ও শুল্ককর ফাঁকির দায়ে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, যা বিচারাদেশের অপেক্ষায় রয়েছে। অপরদিকে, খোলাবাজারে একটি চালান বিক্রি করতে পারেনি। মূলত কার্টিং তদারকি দেওয়ায় প্রতিষ্ঠান বিপাকে পড়েছে। কারণ প্রতিষ্ঠানে পোশাক তৈরির সেই সক্ষমতা নেই। আর বন্ডের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৫ জুলাই আমদানি করা ২০ হাজার ৯৮২ কেজির একটি চালান কার্টিং তদারকি দেওয়ায় তা এখনো শেষ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠান। অপরদিকে, ১৫ এপ্রিল আমদানি করা একটি চালানে ১৬ হাজার ১২১ কেজি কাপড় বিক্রি করে ৭০ লাখ ৩৭ হাজার ৯৩৭ টাকা শুল্ককর ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠান। খোলাবাজারে বিক্রি প্রমাণ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানকে ৭০ লাখ ৪০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট সূত্রমতে, ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ফোকাস অ্যাপারেলস বিডি লিমিটেডকে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রেজাউল করিম ও চেয়ারম্যান হিসেবে শিরিন সুলতানা আক্তারের নাম রয়েছে। পরিচালক হিসেবে মো. ইমাম হোসেন ও মো. মোস্তাফিজুর রহমানের নাম রয়েছে। কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এই লাইসেন্স দিয়েছে। তবে লাইসেন্সের যেসব শর্তের কথা বলা হয়েছে, তা লাইসেন্সের কাগজে থাকলেও বাস্তবে বেশিরভাগ নেই বলে বলে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। অপরদিকে, ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তাওয়াক্কুল অ্যাপারেলকে বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এই লাইসেন্সে ম্যানেজিং পার্টনার করা হয়েছে রেজাউল করিমের স্ত্রী ফাহমিদা সুলতানাকে। এছাড়া আবিদা সুলতানাকে পার্টনার করা হয়েছে। কমিশনার মোহাম্মদ লুৎফর রহমান এই লাইসেন্স দিয়েছেন। তবে দুইটি লাইসেন্সে মো. রেজাউল করিমের মোবাইল নাম্বার দেওয়া হয়েছে। এই লাইসেন্সও একইভাবে দেওয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
অপরদিকে, এফওসিতে আমদানি করা কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি এবং ভুয়া রপ্তানি দেখানোর বিষয়টি অস্বীকার করেন মো. রেজাউল করিম। তিনি বিজনেস বার্তাকে বলেন, আমাদের ইম্পোর্ট ও এক্সপোর্টের কোন অসামসঞ্জতা নেই। এই মূহর্তে আমাদের কোন এফওসি নেই, এফওসির মাল খালাসও করি নাই। আগে যত এফওসি ছিলো, সবগুলো এক্সপোর্ট হয়েছে, সব অডিট সম্পূর্ণ করা আছে। ২০২১ থেকে চলতি বছরের প্রথম পর্যন্ত এফওসিতে আমদানি করা পলিস্টার ফেব্রিক্সস ইসলামপুরে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কখনো বিক্রি করিনি। ভুয়া রপ্তানির বিষয় অস্বীকার করে বলেন, আমাদের সব ডকুমেন্ট ঠিক আছে। বন্ড অডিট করেছে। সাব-কন্ট্রাক্ট জালিয়াতির বিষয়ে মো. রেজাউল করিম বলেন, কোন কাগজ জাল হয়নি।
