দেশের ব্যাংক খাতে আমানতের বড় ভিত্তি গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অংশগ্রহণে। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যক্তিশ্রেণির আমানত হিসাবের প্রায় ৯৩ শতাংশেই জমা ছিল ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। এসব হিসাবে মোট জমার পরিমাণ ১ লাখ ৬৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা ব্যক্তিগত আমানতের প্রায় ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে ২ লাখ ১ টাকা থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ হিসাবে। তবে টাকার অঙ্কে এই শ্রেণির আমানতকারীদের অবদান সবচেয়ে বেশি। এ শ্রেণিতে জমা রয়েছে ৬ লাখ ৯২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা ব্যক্তিশ্রেণির মোট আমানতের প্রায় ৫৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট, জুন ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যক্তি ও পরিবারের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুনে এর পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যক্তিশ্রেণির আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যক্তিগত আমানত হিসাবের সংখ্যা ১৫ কোটি ৮৫ লাখ ৪২ হাজার ৪৫৮টি থেকে বেড়ে ১৭ কোটি ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৭০টিতে দাঁড়িয়েছে। সে হিসাবে এক বছরে হিসাব বেড়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখ।
ব্যাংকের আমানত হিসাবের সবচেয়ে বড় অংশ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত জমাকারীদের। ২০২৬ সালের জুন শেষে এ শ্রেণিতে হিসাবের সংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৯১ হাজার ৭৯৪টি, যা মোট ব্যক্তিগত আমানত হিসাবের প্রায় ৯৩ শতাংশ। তবে এসব হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৬৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যা ব্যক্তিশ্রেণির মোট আমানতের প্রায় ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে এই শ্রেণির আমানতকারীরা সবচেয়ে বড় হলেও মোট জমার পরিমাণে তাঁদের অংশ তুলনামূলকভাবে কম। ২০২৫ সালের জুনে এ শ্রেণিতে হিসাব ছিল ১৪ কোটি ৭৬ লাখ ৪৯ হাজার ৪৫৬টি এবং জমার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে হিসাবের সংখ্যা ও জমার পরিমাণ উভয়ই বেড়েছে।
অন্যদিকে ২ লাখ ১ টাকা থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে ১ কোটি ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৯০৭টি হিসাবে। মোট ব্যক্তিগত আমানত হিসাবের মাত্র ৭ শতাংশের মতো হলেও এ শ্রেণিতে জমা রয়েছে ৬ লাখ ৯২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা মোট ব্যক্তিগত আমানতের প্রায় ৫৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে এ শ্রেণিতে আমানতের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে তা বেড়েছে ৮৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। একই সময়ে হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ২ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫২টি থেকে বেড়ে ১ কোটি ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৯০৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
২৫ লাখ ১ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে ৪ লাখ ৬৬ হাজার ১১৮টি হিসাবে। এ শ্রেণিতে মোট জমার পরিমাণ ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুনে এ ধরনের হিসাব ছিল ৪ লাখ ৯ হাজার ৪৫৫টি এবং জমার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৫৬ হাজার ৬৬৩টি এবং আমানত বেড়েছে ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
এদিকে ৫০ লাখ ১ টাকা থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৫০টি হিসাবে। এসব হিসাবে মোট জমার পরিমাণ ১ লাখ ৩১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুনে এ শ্রেণিতে হিসাব ছিল ১ লাখ ৭২ হাজার ৫৯টি এবং আমানতের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
১ কোটি থেকে ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে ৪০ হাজার ৫৯৯টি হিসাবে। হিসাবের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও এ শ্রেণিতে জমা রয়েছে ৮৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুনে এ শ্রেণিতে ৩৬ হাজার ৯৩২টি হিসাবে জমা ছিল ৮২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে হিসাবের সংখ্যা ও আমানতের পরিমাণ দুটিই বেড়েছে। ২৫ কোটি ১ টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানত রয়েছে মাত্র ৮৭টি হিসাবে। এসব হিসাবে জমার পরিমাণ ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুনে এ শ্রেণিতে হিসাব ছিল ৭৮টি এবং জমার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত রয়েছে মাত্র ১৫টি হিসাবে। ২০২৬ সালের জুন শেষে এসব হিসাবে জমা অর্থের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুনে এ ধরনের হিসাব ছিল ২৬টি এবং জমার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হিসাবের সংখ্যা ১১টি কমেছে। একই সঙ্গে জমার পরিমাণ কমেছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতের মোট আমানতের কাঠামোতেও ব্যক্তিশ্রেণির আমানতকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট আমানতের ৮৪ শতাংশ ছিল বেসরকারি খাতের। এর মধ্যে ব্যক্তি ও পরিবারের আমানতের অংশ ৫৬ শতাংশ। অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন, আর্থিক সহায়ক প্রতিষ্ঠান ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের আমানত ছিল ২৮ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারি খাতের আমানতের অংশ ছিল ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশ ১১ শতাংশ।
ব্যক্তিশ্রেণির আমানত হিসাবের সংখ্যাও এক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুনে পরিবারগুলোর আমানত হিসাব ছিল প্রায় ১৫ কোটি ৯ লাখ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ১৭ কোটি ৪৩ লাখ ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছরে পরিবারের আমানত হিসাব বেড়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে পরিবারের মোট আমানত ১১ লাখ ৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১২ লাখ ৪৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
