** খুচরা ও এসএমই খাত থেকে বছরে ৪,৮০০ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় সম্ভব
** দুটি খাতে এক বা দুই পাতার ভ্যাট রিটার্ন বাধ্যতামূলক হচ্ছে
** ভ্যাট নিবন্ধন ও রিটার্ন সহজ করার দাবি খুচরা-এসএমই উদ্যোক্তাদের
দেশের সবচেয়ে বড় খাত হলো রিটেইল বা খুচরা ব্যবসা খাত। পাড়ার মুদি দোকান থেকে শপিংমল— সবই রিটেইল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ খাতে ছোট-বড় প্রায় ২০ লাখ প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার এক তৃতীয়াংশের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। এদিকে এসএমই খাতেও আছে ছোট-বড় প্রায় ৯০ লাখ প্রতিষ্ঠান। দুটি খাতেই বিপুল পরিমাণ প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। উদ্যোক্তাদের দাবি, ভ্যাট নিবন্ধন ও রিটার্ন– দুটোই খুবই জটিল। এই দুই খাতে বেশিরভাগ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ফলে নিবন্ধন ও ভ্যাট রিটার্ন সহজ করা এবং ভ্যাট দেওয়ার পদ্ধতি সহজ করা হলে উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসবেন।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, এই বড় দুই খাতে ভ্যাটের বিপুল সম্ভাবনা থাকায় দুই খাতের জন্য রিটার্ন একেবারে সহজ বা এক থেকে দুই পাতার করা হচ্ছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই ঘোষণা থাকবে। এই দুই খাত থেকে অন্তত ২০ লাখ প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনা যাবে, যাদের থেকে মাসে ১ হাজার টাকা করে হলে ২০০ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় সম্ভব, যা বছরে দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আর ২ হাজার টাকা করে হলে মাসে ৪০০ কোটি আর বছরে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় সম্ভব হবে।
এনবিআরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭ লাখ ৯২ হাজার ৩৯৮টি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ১৬ হাজার ৬১৪টি রিটেইল বা ক্ষুদ্র খাতের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া সার্ভিস খাতে ৩ লাখ ১৬ হাজার ১৫৩টি, আমদানি ও রপ্তানি খাতের ৯৭ হাজার ৩৯১টি, উৎপাদন খাতে ৪৭ হাজার ৯৯৩টি ও অন্যান্য খাতে ১৪ হাজার ২৪৭টি ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
খুচরা ব্যবসা খাত
পাড়ার মুদি দোকান থেকে শুরু করে আউটলেট– সবই রিটেইল খাতের প্রতিষ্ঠান। এছাড়া শপিংমল, সুপারশপ, ব্র্যান্ডের শোরুম, ফার্নিচার, ওষুধের দোকান, কনস্ট্রাকশন, হার্ডওয়্যার, ই-কর্মাস বা অনলাইন ব্যবসাও রিটেইল খাতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দেশের মোট খুচরা ভোগের প্রায় ৯৮ শতাংশ এই খাত থেকে আসে। তবে প্রতিষ্ঠানের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ধারণা করা হয়, এই সংখ্যা ২০ লাখের বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৭ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি স্থায়ী রিটেইল ও শপিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ৬০ হাজারের বেশি হোম ও ফার্নিচার, ৫৫ হাজারের বেশি ওষুধ ও ফার্মা, ৫৬ হাজারের বেশি শপিং সেন্টার, ৩১ হাজারের বেশি কনস্ট্রাকশন ও হার্ডওয়্যার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে ২০ লাখের বেশি খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৩ লাখ ১৬ হাজার প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন রয়েছে। যার মধ্যে অর্ধেক প্রতিষ্ঠান আবার ভ্যাট দেয় না।
ভ্যাট বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রিটেইল খাত এত বড় হওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পায় না এনবিআর। এসব খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তদারকি করার মতো মাঠ পর্যায়ে এত জনবলও নেই। আবার নিবন্ধন নেওয়া ও মাসে রিটার্ন দেওয়া– দুটোই তাদের কাছে সমস্যার। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান অন্যান্য সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হলে নিবন্ধন বেড়ে যাবে। আবার নিবন্ধন ও রিটার্ন সহজ করা হলে ২০ লাখের মধ্যে অন্তত ১০ লাখের বেশি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের আওতায় চলে আসবে। ১০ লাখ প্রতিষ্ঠান মাসে ২ হাজার টাকা করে ভ্যাট দিলে মাসে অন্তত ২০০ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় সম্ভব হবে।
এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠান
সূত্রমতে, দেশে এসএমই খাতকে অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয়। এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট নয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি, সেবা খাত ও শিল্প খাতে এসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি। এর মধ্যে সিংহভাগই হলো কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। ক্ষুদ্র ও মাঝারি হিসেবে ধরলে এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ। আবার সেবা খাতে ৯০ শতাংশ, শিল্প খাতের ১০ শতাংশ ও ব্যবসা খাতের ৪০ শতাংশ এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠান। জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৫ থেকে ২৮ শতাংশ। এসএমই খাত থেকে প্রতিবছর কি পরিমাণ রাজস্ব আদায় হয়, তার সঠিক হিসাব নেই। তবে মোট আহরিত রাজস্বের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে এমএসই খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে আদায় হয়।
ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসএমই খাতের বহু প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। এর কারণ হলো অনেক ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান রয়েছে যে, তারা নিবন্ধন নিলে বর্তমানে ভ্যাটের রিটার্ন দিতে পারবে না। আর প্রতিমাসে রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। বর্তমানে যে ভ্যাট রিটার্ন রয়েছে, তা বেশ জটিল। ভ্যাট রিটার্ন সহজ করা হলে বহু প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন নিতে আগ্রহী হবে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নেওয়া ও ভ্যাট রিটার্ন দেওয়ার সক্ষমতা থাকার পর নিবন্ধন নেয় না। সেজন্য আমরা রিটার্ন সহজ করে দেব। আর কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন না নিলে এসএমই খাতের এসব প্রতিষ্ঠান সেবাও নিতে পারবে না। ফলে বাধ্য হয়ে নিবন্ধন নেবে ও রিটার্ন দেবে। এই খাতে নিবন্ধনে এনবিআর থেকে সহযোগিতা করা হলে অন্তত ২০ লাখ নিবন্ধন বাড়বে। ১ হাজার টাকা করে হলে মাসে ২০০ কোটি, আর ২ হাজার টাকা করে হলে মাসে ৪০০ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় সম্ভব।
