কার্তিক মাসের শেষভাগে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে, কুয়াশাও জানান দিচ্ছে শীতের আগমন। এ সময়েই রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছ থেকে স্বল্প পরিসরে রস সংগ্রহ শুরু হয়েছে, আর সেই রস থেকেই তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু খেজুরের গুড়। কৃষিসংশ্লিষ্টদের মতে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় দুইশ কোটি টাকার গুড় বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ হাজার মেট্রিক টন। এতে রাজশাহীর স্থানীয় অর্থনীতি প্রাণবন্ত হবে এবং কর্মসংস্থান তৈরি হবে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল আট হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। গত মৌসুমে ১৭৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রস ও গুড় থেকে ১৪১ কোটি ৮২ লাখ টাকা আয় হয়েছে। চলতি বছরে গুড় উৎপাদন এবং বিক্রির সম্ভাবনা আরও বেড়েছে।
দেশজুড়ে খ্যাতি পাওয়া খেজুরের গুড়ের জন্য রাজশাহী ও যশোর অঞ্চল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাজশাহীর দুর্গাপুর, বাঘা, পুঠিয়া এবং চারঘাট উপজেলায় সবচেয়ে বেশি খেজুরগাছ রয়েছে, আর গুড় উৎপাদনের জন্য এ এলাকাগুলো ইতোমধ্যে সুনাম অর্জন করেছে। জেলায় প্রায় ২৮ হাজার পরিবার খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। রাজশাহীর ৫৪৩ হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত ১১ লাখ ১১ হাজার ৩৪৩টি খেজুরগাছ। খেজুরশিল্পে জড়িত আছেন ৪৯ হাজার ৭১১ জন চাষি। এছাড়া ৬৪৪ জন ব্যবসায়ী এবং ৯০টি আড়ত আছে। পুরো জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুড় উৎপাদন হয় বাঘা উপজেলায়।
এ উপজেলার আড়ানি পৌরসভা সদরের চাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার প্রায় ৭০টি খেজুর গাছ রয়েছে। স্থানীয় আড়ানি বাজারে গুড় বিক্রি করি। পাশাপাশি অনলাইনে সারা দেশে ভেজালমুক্ত খাঁটি খেজুর গুড় সরবরাহ করি। প্রতিবছরের মতো এবারও অনলাইনে গুড় বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছি। বাঘার তেঁতুলিয়া গ্রামের গাছি আবুল কালাম বলেন, আমার ৯০টি গাছের সঙ্গে আশপাশের কয়েকজন মালিকের কাছ থেকে আরও ৮০টি গাছ ইজারা নিয়েছি। প্রতিটি গাছের জন্য মালিককে দিতে হবে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। এসব গাছ থেকে রস আহরণ শুরু করেছি। শীত জেঁকে বসলে একটি পরিণত খেজুর গাছ থেকে দিনে ৪ থেকে ১০ লিটার রস পাওয়া যায়। গত শীত মৌসুমে গাছের রস থেকে গুড় তৈরি করে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আয় হয়েছে। এছাড়া আমার এখানে ৪৫ জন মানুষ কাজ করেন।
বাঘার মেসার্স আপেল অ্যাগ্রোর মালিক আপেল হোসেন বলেন, সপ্তাহে রবি ও বৃহস্পতিবার বাঘায় গুড়ের হাট বসে। শীতের সময় প্রতি হাটে শতাধিক টন গুড় বেচাকেনা হয়। ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ গুড় যায়। পুঠিয়ার পিএস অনলাইন মার্কেটের স্বত্বাধিকারী পরিনা বলেন, সবেমাত্র গুড় বিক্রি শুরু হয়েছে। আমি এখনো শুরু করিনি। কারণ ঠান্ডা যত পড়বে, গুড়ের স্বাদও বাড়তে থাকবে। আমি অনলাইনের মাধ্যমে সারা দেশেই গুড় সরবরাহ করি। তবে ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং সিলেটে গুড়ের চাহিদা বেশি।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ছয় থেকে সাত বছর বয়সের মধ্যে রস দেওয়া শুরু করে খেজুর গাছ। একটি গাছ ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত রস দেয়। রস সংগ্রহের উপযোগী করতে কার্তিকের শুরু থেকেই গাছিরা খেজুর গাছ পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। খেজুরের গুড়কে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতি চাঙা হয়ে উঠেছে। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে প্রায় দুইশ কোটি টাকা বাণিজ্য হবে বলে আশা করছি।

