দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নানা স্থানে আইসিইউ শয্যা না পেয়ে একের পর এক শিশুমৃত্যুর অভিযোগ উঠছে। হামের প্রাদুর্ভাবের এই সময়ে রাজধানী ও জেলা শহরের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ এখন যেন ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হয়েছে। একটি শয্যা পেতে অনেক রোগী ও তাদের স্বজনদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে—কেউ সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পাবেন, অথবা কারও মৃত্যু ঘটবে—তবেই মিলছে নতুন রোগীর জন্য জায়গা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে মোট ১ হাজার ৬২০টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশই অচল। একই সঙ্গে ১৯টি জেলা সদর হাসপাতালের আইসিইউ সেবা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, করোনা মহামারির সময় বিপুল অর্থ ব্যয়ে স্থাপিত দেশের ১০টি বিভাগীয় ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ৪৩টি জেলা সদর হাসপাতালের অধিকাংশ আইসিইউ এখন অচল হয়ে আছে। এসব ইউনিটে প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হলেও অনিয়ম-দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। ফলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পের একটি অংশ ফেরত চলে গেছে। এর প্রভাবে অনেক হাসপাতালে পরিকল্পনা থাকলেও আইসিইউ ও পিআইসিইউর যন্ত্রপাতি কেনা বা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। কোথাও অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি কেনা হলেও তা বছরের পর বছর ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আবার কিছু হাসপাতালে আইসিইউ চালু থাকলেও সেগুলোর মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট শয্যার অন্তত ১০ শতাংশ আইসিইউ থাকা প্রয়োজন। তবে বাস্তবে সেই মানদণ্ড থেকে অনেকটাই পিছিয়ে দেশ। করোনার সময় সারা দেশে আইসিইউ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল। এরপর ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর ভয়াবহতায় আবারও আইসিইউর ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব নতুন করে এই সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো, দেশের অধিকাংশ আইসিইউ সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে আইসিইউ শয্যার সঠিক পরিসংখ্যান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই। ধারণা করা হয়, দেশে বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৮০০ থেকে ৯০০টির মধ্যে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় তা দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে অধিকাংশ মানুষ ভিড় করছেন সরকারি হাসপাতালে, যেখানে একটি আইসিইউ শয্যা পেতে কার্যত প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট শুধু অবকাঠামোর ঘাটতি নয়; বরং পরিকল্পনার দুর্বলতা, দক্ষ জনবলের অভাব এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতারই প্রতিফলন।
১৯ জেলা হাসপাতালে বন্ধ আইসিইউ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৯ জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ সেবা বন্ধ রয়েছে। এসব হাসপাতালের মধ্যে রয়েছে বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল, চুয়াডাঙ্গা জেলা হাসপাতাল, ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল, হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল, ঝালকাঠি জেলা হাসপাতাল, কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতাল, পিরোজপুর জেলা হাসপাতাল, রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল, সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা আধুনিক সদর হাসপাতাল, দিনাজপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, নড়াইল জেলা হাসপাতাল, নরসিংদী ১০০ শয্যা জেলা হাসপাতাল, নীলফামারী ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল, নেত্রকোনা জেলা হাসপাতাল, পঞ্চগড় জেলা হাসপাতাল, বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, বান্দরবান ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল ও মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল।
আইসিইউর খরচ
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউর জন্য আলাদা কোনো ফি দিতে হয় না। তবে রোগীর বেশিরভাগ ওষুধপত্রই বাইরে থেকে কিনতে হয়। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আইসিইউর ভাড়া একেকরকম। এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম-ডাক যত বড়, আইসিইউর ভাড়াও তত বেশি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভিআইপি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ২৪ ঘণ্টার আইসিইউর ভাড়া ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কোনো কোনোটি আবার এক লাখ টাকাও রয়েছে। আবার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের ভাড়া দিনে ৩০-৩৫ হাজার টাকা হলেও মানহীন সেবা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও কোনো কোনো ক্লিনিকের আইসিইউর সিঙ্গেল কেবিন সাত হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং শেয়ার কেবিন আইসিউর ভাড়া সাত হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
প্রকল্প বন্ধ, ঝুঁকিতে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, করোনা মহামারির সময় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সক্ষমতা বাড়াতে তড়িঘড়ি করে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (২য় সংশোধিত)’ (ইআরপিপি) প্রকল্প নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলা সদর হাসপাতালে আধুনিক আইসিইউ, পিআইসিইউ, অক্সিজেন ব্যবস্থা, ল্যাব সুবিধা ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা চালু করা। প্রথমে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০০০ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত। পরে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে কয়েক দফা সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ছয় হাজার ৩৮৬ কোটি টাকার বেশি।
প্রকল্পটির আওতায় ৫০টি জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ, ২০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিট, পিআইসিইউ, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে প্রকল্প বাস্তবায়নে ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা, দীর্ঘসূত্রতা, সমন্বয়হীনতা এবং অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পের টাকার একটি অংশ ফেরত যাওয়ায় সেই অবকাঠামোর বড় অংশই এখন অচল হয়ে পড়ে আছে। কোথাও তালাবদ্ধ ইউনিট, কোথাও যন্ত্রপাতি অকেজো হওয়ার পথে, আবার কোথাও জনবল না থাকায় চালুই করা যায়নি আইসিইউ।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অধীনে দেশের ১০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ১৩ জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ সেবা এবং ৩০টি সরকারি হাসপাতালে লিকুইড অক্সিজেন সেবা চালু হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, ৫০টি জেলা হাসপাতালে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে মাত্র ১৩টি হাসপাতালে আইসিইউর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে আবার তিন হাসপাতালে কাজ করা আর সম্ভব নয়। আর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটসহ ১৬টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিআইসিইউর বিপরীতে একটির কাজও শেষ হয়নি। একইভাবে ১৫ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রসূতি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) কাজের হার শূন্য।
প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সবগুলো হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন করা সম্ভব নয়। আবার যেসব হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোতে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই, প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে তা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার কিছু কিছু হাসপাতালে শতভাগ যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হলেও কার্যত বন্ধ রয়েছে। নানা জটিলতার কারণে ফাংশনাল করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রকল্প নথি অনুযায়ী যন্ত্রপাতি কেনার দায়িত্ব ছিল প্রকল্প অফিসের, আর অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু শুরু থেকেই নির্মাণকাজে ধীরগতি থাকায় আইসিইউ ও পিআইসিইউ স্থাপনের কাজ পিছিয়ে যেতে থাকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের একটি অংশ ফেরত চলে যায়। এতে কয়েকটি হাসপাতালে পরিকল্পনা অনুযায়ী যন্ত্রপাতি কেনা ও স্থাপনই সম্ভব হয়নি।
আইএমইডির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, সময়স্বল্পতার কারণে একাধিক দরপত্র আহ্বান বন্ধ রাখতে হয়। আবার কিছু হাসপাতালে অবকাঠামো প্রস্তুত হলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পৌঁছায়নি। ফলে কক্ষ, পাইপলাইন ও প্রযুক্তিগত সুবিধা তৈরি থাকলেও সেবা চালু করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অসমাপ্ত কাজগুলো পঞ্চম জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচির আওতায় শেষ করার আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকার প্রকল্পভিত্তিক নতুন ব্যবস্থায় চলে যাওয়ায় সে উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি। এতে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল যশোরের মতো অনেক হাসপাতালে অবকাঠামো বছরের পর বছর অচল অবস্থায় পড়ে আছে। তবে সিলেট, দিনাজপুর, ফরিদপুর ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বেশকিছু স্থানে নতুন করে ১০ শয্যার আধুনিক আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শুরু থেকেই কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় প্রকল্পের গতি ধীর হয়ে পড়ে; এর সঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাজের বিলম্ব, বিলসংক্রান্ত জটিলতা এবং বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের মতো কারণে বাস্তবায়নে বড় ধরনের দেরি হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের অর্থের একটি অংশ ফেরত চলে যায় এবং প্রকল্পটি আর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স ও টেকনিশিয়ানের অভাবে অনেক আইসিইউ সচল রাখা যাচ্ছে না; এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ভেন্টিলেটর, মনিটর, অক্সিজেন সাপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থেকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান জানান, দেশে আইসিইউ ও পিআইসিইউর ঘাটতি রয়েছে, যা শুধু বাংলাদেশেই নয়, অন্যান্য দেশেও দেখা যায়; তবে এই সংকট কাটাতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং যেখানে আইসিইউ নেই বা জনবলের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না, সেগুলো দ্রুত সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শিশু হাসপাতালে আইসিইউ সংকট চরমে
হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে প্রতিনিয়তই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোগীরা ছুটে আসছেন। কিন্তু বিশেষায়িত ওয়ার্ডের পাশাপাশি আইসিইউতেও সিটসংখ্যা কম। ফলে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব এবং নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সদের। সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার সবগুলোই পরিপূর্ণ। ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিশুর বয়স এক বছরের কম। এসব শিশুর কারো কারো সারা শরীরে ছোপ ছোপ দাগ ও ফুসকুড়ি রয়েছে। শরীরে চলছে স্যালাইন, কারো নাকে নল; আবার কোনো কোনো শিশুর মুখে অক্সিজেন লাগানো। প্রচণ্ড জ্বর আর ব্যথায় অনবরত কেঁদেই যাচ্ছে শিশুরা। পাশেই বসা তাদের মা-বাবা কিংবা স্বজনদের দুই চোখ টলমল করছে। সন্তানের যন্ত্রণাকাতর মুখচ্ছবি দেখে নীরবে লড়াই করছেন অভিভাবকরা। অনেককেই আইসিইউ শয্যা ফাঁকা না পেয়ে রোগীদের নিয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে যেতে দেখা গেছে। আইসিইউতে শয্যা পাওয়ার জন্য সেখানে থাকা কারো মৃত্যু অথবা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে অন্য রোগীদের।
হাসপাতালের তথ্যমতে, বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ৪৪টি। এ ওয়ার্ডের ভেতরেই আছে ১৬ শয্যার একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। অথচ আইসিইউর একটি সিটের জন্য প্রতিদিন গড়ে ২০ জন আবেদন করেন। শুধু কোনো রোগী মারা গেলে কিংবা সুস্থ হয় বাড়ি ফিরলেই সিট ফাঁকা হয়। এ ব্যাপারে শিশু হাসপাতালে আইসিইউর দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, আইসিইউ সংকট শুধু আমাদের এখানেই নয়, অনেক হাসপাতালেই হচ্ছে। আইসিইউ ইউনিটে যত রোগী ভর্তি থাকে, অপেক্ষায় থাকে তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি। কারণ, হামের পাশাপাশি বেশিরভাগ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায়। ঢাকার বাইরের রোগীদের মূলত আইসিইউর জন্য এখানে আনা হয়। কিন্তু সময়মতো পিআইসিইউ বা ভেন্টিলেশন সাপোর্ট না পাওয়ায় রোগীর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ে। চাহিদা অনুযায়ী জনবল ও সাপোর্ট সিস্টেম না থাকায় অনেক রোগীকে আমরা আইসিইউ সেবা দিতে পারি না। আইসিইউর সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয়ভাবে ৪০০ কিংবা ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল চালু করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি। বিশেষজ্ঞরা জানান, আইসিইউ পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রয়োজন। মূলত অ্যানেসথেসিয়া ও জরুরি ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন শাখার বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসরা আইসিইউর দায়িত্বে থাকেন। কিন্তু দেশে সে ধরনের দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু আইসিইউ স্থাপন করলেই যথেষ্ট নয়; তা পরিচালনার সক্ষমতাও থাকতে হয়, যা দেশে এখনো ঘাটতিপূর্ণ। কোভিডের সময় সরকার আইসিইউ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিল এবং কিছু প্রতিষ্ঠানে আরটি পিসিআর ও লিকুইড অক্সিজেন সিস্টেম চালুও করা হয়েছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি বরাদ্দের একটি অংশ ফেরতও চলে যায়। তার মতে, আইসিইউর প্রয়োজনীয়তাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়াই এর অন্যতম কারণ। ধারণা করা হয়েছিল, করোনার মতো সংকট হয়তো আর দীর্ঘ সময় আসবে না; কিন্তু বাস্তবে শিশু নিবিড় পরিচর্যা সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে এখনো নানা রোগে অনেক শিশুর মৃত্যু ঘটছে। তিনি আরও বলেন, যে কোনো রোগ মোকাবিলায় হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে সমন্বিত ও শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি, যা এখনো দেশে পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
