১৭ পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ৩৩.৭০ কোটি টাকা

নেপালে ইউএস বাংলার বিমান বিধ্বস্ত

নেপালে ইউএস-বাংলাকে উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় হতাহত ১৭ পরিবারকে দায়সীমার বেশি ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরো ২৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার বা ৩৩কোটি ৭০ লাখ ২০ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসেবে) দিতে নির্দেশ দিয়েছে কাঠমান্ডু আদালত। এ হিসেবে প্রতিটি পরিবার পাবে ১ কোটি ৯৮ লাখ ২৪ হাজার ৭০৬ টাকা। গত ২০ জানুয়ারি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় অনুযায়ী, দুর্ঘটনার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত দায়সীমার বাইরে গিয়ে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনকে দায়ী করেছে নেপালের এভিয়েশন।

আদালত রায়ে বলা হয়েছে, পাইলট ও ফ্লাইট অফিসারের অবহেলা ও বেপরোয়া আচরণের কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটায় সংশোধিত ওয়ারস কনভেনশনের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এয়ারলাইনটির দায়ের পরিমাণ ক্ষতিপূরণের সীমার বাইরে পড়বে। এ দুর্ঘটনাকে কেবল নির্ধারিত দায়ের মধ্যে ফেলা যায় না। দুর্ঘটনার প্রকৃতি ও পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ধরনের অবহেলা ও বেপরোয়া আচরণের জন্য এয়ারলাইনটির ওপর সীমাহীন দায় বর্তায়।ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের সীমাহীন দায় রয়েছে, তাই ক্ষতিপূরণ ঠিক করতে ভুক্তভোগীদের অবস্থা ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করতে হবে। মৃত্যুর ক্ষেত্রে নির্ভরশীলদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ-উভয় ক্ষতিই বিবেচনায় নিতে হবে, যা দায়সীমার আওতাভুক্ত নয়। রায়ের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সংশোধিত ওয়ারস কনভেনশনের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে বা ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা জেনেও বেপরোয়া আচরণের কারণে ক্ষতি হলে দায়সীমা প্রযোজ্য হয় না।

কাঠমান্ডু জেলা আদালত রায়ে বলেছে, ১৯২৯ সালের ওয়ারস কনভেনশন এবং ১৯৫৫ সালে হেগে সংশোধিত ওয়ারস কনভেনশন অনুযায়ী, এয়ারলাইনের কাছ থেকে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে যাত্রীদের। কনভেনশনের ২২ অনুচ্ছেদে ক্ষতিপূরণের ভিত্তিসূচক ঠিক করা আছে। নিহতদের অভিভাবকদের তরফে সংশোধিত ওয়ারস কনভেনশনের ২২ অনুচ্ছেদ, মন্ট্রিল কনভেনশনের ২২ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের সিভিল কোডের ৬৮২(৬) ধারার ভিত্তিতে মামলাটি দায়ের করা হয়। কাঠমান্ডু আদালত নিহতদের পরিবারকে পুরো ক্ষতিপূরণ দিতে বাংলাদেশের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে নির্দেশ দিয়েছে। বীমা কোম্পানি থেকে প্রতি পরিবারকে ২০ হাজার ডলার করে যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বাইরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে মোট ২৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার পরিশোধ করতে হবে। এ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হবে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৭টি পরিবারকে। সাত বছরের আইনি লড়াইয়ের পর আদালত এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, প্রয়োজনীয় মান অনুসারে উড়োজাহাজ পরিচালনায় ব্যর্থ হওয়ার জন্য এয়ারলাইনসটির ‘চরম অবহেলা’ দায়ী।

কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দাবি করেছিল, দায় স্বীকার না করেই তারা ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল ওয়ারস কনভেনশনের ২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার ডলার করে দিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের আইনে ২৫ নিহত বাংলাদেশি যাত্রীর উত্তরাধিকারীদের ৫০ হাজার ডলার করে পরিশোধ করার কথা জানিয়েছিল এয়ারলাইনটি। আরও দুজনের ক্ষেত্রে সমঝোতা হলেও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ ছিল। এয়ারলাইনটি যুক্তি দিয়েছিল যে, নেপালি আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ ২০ হাজার ডলারে সীমাবদ্ধ এবং যেহেতু ফ্লাইটটির চূড়ান্ত গন্তব্য ঢাকা ছিল, তাই নেপালি আদালতের বিচারের এখতিয়ার নেই। ১৯৯৯ সালের মন্ট্রিল কনভেনশনের ২১(২) অনুচ্ছেদেও অনুরূপ বিধান রয়েছে। সীমার বেশি দায় দাবি করা হলে, অবহেলা ছিল না-এটি প্রমাণের দায় এয়ারলাইনেরই ওপর পড়ে। এয়ারলাইন তা প্রমাণে ব্যর্থ হলে সীমার বেশি দায় প্রযোজ্য হয়। এক্ষেত্রে আদালত ১৯৮১ সালের গোল্ডম্যান বনাম থাই এয়ারওয়েজ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড মামলার প্রসঙ্গ সামনে এনেছে; যেখানে যুক্তরাজ্যের আদালত ‘ইচ্ছাকৃত অসদাচরণ’ বলতে ইচ্ছা বা বিষয়গত বেপরোয়া আচরণ বোঝায় বলে ব্যাখ্যা করেছিল। নিরাপত্তা বিধি ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করা হলে তা ইচ্ছাকৃত অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং তখন দায়সীমা প্রযোজ্য হয় না। আদালত বলেছে, ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গন্তব্যস্থলে মামলা করা যায় এবং এক্ষেত্রে নেপালই গন্তব্য, কারণ নিহতরা পড়াশোনার জন্য বাংলাদেশে গিয়ে রাউন্ড-ট্রিপ টিকেটে নেপালে ফিরছিলেন।

ইউএস-বাংলা দাবি করেছিল, কনভেনশনের ২৮ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হয়েছে এবং মামলাটি মূল বিষয়ে না গিয়েই খারিজ করা উচিত। এয়ারলাইনসটি এও দাবি করেছিল, ২৫ অনুচ্ছেদ কেবল তখনই প্রযোজ্য, যখন ইচ্ছাকৃত বা ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা জেনেও বেপরোয়া আচরণ করা হয়-যা প্রমাণ করতে পারেনি বাদীরা। এসব যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে আদালত বলেছে, নিহতদের স্বজন ও নেপালি নাগরিক হিসেবে বাদীদের মামলা করার আইনগত অধিকার রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২০ জুলাই বিচারক দিবাকর ভট্ট এ রায় ঘোষণা করেন। ১৬ জন নিহত যাত্রীর পরিবার এবং একজন জীবিত যাত্রী মামলাটি দায়ের করেছিলেন। গত ২০ জানুয়ারি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।

This will close in 5 seconds