১৫ বছর ধরে হীরার বদলে কাচ বিক্রি করেছেন দিলীপ

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। মঙ্গলবার গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখা। তার বিরুদ্ধে সোনা ও হীরা চোরাচালান, বিদেশে অর্থপাচার, প্রতারণা এবং জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আজাদ রহমান বলেন, দিলীপ কুমার আগরওয়ালা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন জেলায় নামমাত্র শো–রুমের মাধ্যমে প্রকৃত ডায়মন্ডের বদলে উন্নতমানের কাচের টুকরাকে ডায়মন্ড হিসেবে বিক্রি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি দুবাই ও সিঙ্গাপুরে সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ভারতের কলকাতায় তিনটি জুয়েলারি দোকান ও ১১টি বাড়ি এবং মালয়েশিয়া, দুবাই ও কানাডায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে তথ্য রয়েছে।

দেশে ডায়মন্ডের খনি নেই, আমদানিও হয় না, তবুও থেমে নেই ডায়মন্ডের বেচাকেনা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্য উপকমিটির সদস্য এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র হত্যা মামলার আসামি দিলীপ কুমার আগরওয়ালা চোরাই পথে আনা ভেজাল ডায়মন্ডের ব্যবসা করেছেন গত দেড় দশক ধরে। ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেড নামে দিলীপ আগরওয়ালার ২৮টি শোরুম রয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে। এসব শো-রুমে দিনে বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার ডায়মন্ড। কোথা থেকে কীভাবে ডায়মন্ড আসছে জানতে চাইলে সদুত্তর দিতে পারেননি ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের বিক্রয়কর্মীরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, ২০০৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশে ডায়মন্ড ও ডায়মন্ডের গহনা আমদানি হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকার। এরপর থেকে ডায়মন্ডের আমদানি প্রায় বন্ধের কাছাকাছি। এর বাইরে শিল্প খাতে ব্যবহারের জন্য ২০১৯ ও ২০২০ সালে মাত্র তিনটি চালান ছাড়া কোনো জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড আমদানি করেনি। ২০২১ সালে একমাত্র কাটিং ও পলিশিং কারখানা ‘বেঙ্গল ডায়মন্ড লিমিটেড’ অমসৃণ ডায়মন্ড আমদানি করে, আর ‘কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড’ একটি ছোট চালান নিয়ে আসে। ২০২২ সালে দুটি প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড আমদানি করেছে—বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ শিল্প খাতে ব্যবহারের জন্য একটি চালান এবং ঢাকার একটি জুয়েলারি হাউস সাড়ে ৫ হাজার ডলার ঘোষণায় আরেকটি চালান আনে। ফলে গত চার বছরে গড়ে মাত্র সাড়ে তিন লাখ টাকার ডায়মন্ড আমদানি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি না হলেও দেশে ডায়মন্ডের বাজার দিন দিন বড় হয়েছে। ডায়মন্ডের গহনা বিক্রির শতাধিক দোকান রয়েছে। এ ছাড়াও কিছু কিছু সোনার দোকানেও ডায়মন্ডের গহনা বিক্রি হয়। এসব দোকানে বছরে কত টাকার ডায়মন্ডের গহনা বেচাকেনা হয়, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই সরকারের কাছে। দেশের ডায়মন্ডের বাজার নিয়ে সমীক্ষা করা একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, ডায়মন্ডের গহনা বেচাকেনা হয় বছরে ১৮ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার। গড় বাজার হিসাব করা হলে বছরে তা প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার। ব্যাগেজ রুলের আওতায় বিদেশ থেকে ডায়মন্ড আমদানির সুযোগ নেই। তাহলে দেশের বাজারে বেচাকেনা হওয়া এত ডায়মন্ড কোথা থেকে কীভাবে আসছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আমদানির তথ্যমতে, গত ২০ বছরে যত ডায়মন্ড আমদানি হয়েছে, তার অধিকাংশই ভারত থেকে। ভারতের গুজরাটের সুরাটে বিশ্বের ৬৫ শতাংশের বেশি ডায়মন্ড কাটিং ও পলিশিং করা হয়। খুব সহজে বহন করা যায় বলে দেশটি থেকে অবৈধভাবে ডায়মন্ড আসছে, জানান ব্যবসায়ীরা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা ভারত থেকে বাংলাদেশে পাচারের সময় কয়েক বছরে কয়েকটি চালান জব্দ করেছেন। ২০২১ সালে সাতক্ষীরা সীমান্তে পৌনে ২ কোটি টাকার ১৪৪টি ডায়মন্ডের গহনা জব্দ করে বিজিবি। ২০১৮ সালে ৭০ লাখ টাকার ডায়মন্ডের গহনা জব্দ করা হয়। অবৈধ পথে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এসব ডায়মন্ড দেশে আনছিলেন দিলীপ কুমার আগরওয়ালা। বন্ড সুবিধা ছাড়া অমসৃণ ডায়মন্ড আমদানিতে কর ৮৯ শতাংশ। মসৃণ ডায়মন্ড আমদানিতে কর ১৫১ শতাংশ। এই শুল্ক কর ফাঁকি দিতেই মূলত ডায়মন্ড অবৈধ পথে আনা হচ্ছে। গত ২০ বছরে এই মূল্যবান রত্ন আমদানিতে সরকার নামমাত্র রাজস্ব পেয়েছে।

ডায়মন্ডের বাজারে আরেকটি চমকপ্রদ বিষয় হলো দেশের বাজারে দাম। এক ক্যারেট (০.২ গ্রাম) ডায়মন্ডের দাম ৭৯ হাজার টাকা, আর সবচেয়ে ছোট ০.১০ ক্যারেট ডায়মন্ডের দাম ৭ হাজার ৯১৪ টাকা। বাংলাদেশে নাকফুলসহ ডায়মন্ডের অলংকার ১ হাজার টাকার নিচেও বিক্রি হয়। ব্যবসায়ীদের মতে, হীরার ক্ষুদ্র টুকরা ব্যবহার করা হলেও এত কম দামে ডায়মন্ডের গহনা পাওয়া সম্ভব নয়; এগুলো মূলত উন্নতমানের কাচের টুকরা। যদিও আমদানি নেই, দেশে বছরে গড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার ডায়মন্ডের গহনা বিক্রি হচ্ছে। ডায়মন্ডের গহনা তৈরিতে স্বর্ণ ব্যবহার হয়, যা ইতিমধ্যে আমদানি সহজ হয়েছে। দেশে সোনার অলংকার তৈরির দক্ষ কারিগরও রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশ থেকে ডায়মন্ড রপ্তানি করা হলে বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব। এজন্য নীতি সহায়তা বৃদ্ধি এবং অবৈধ ডায়মন্ড আমদানি বন্ধে পদক্ষেপ প্রয়োজন। ডায়মন্ডের ব্যবসায়ীরা ১০০ গ্রাম পর্যন্ত গহনা আনার সুযোগ ব্যবহার করে আরও বেশি ওজনের গহনা ভারত ও দুবাই থেকে আনছে। তবে ৯০ শতাংশের বেশি ডায়মন্ডের গহনা চোরাই পথে ভারত থেকে আসছে।

** ভেজাল হীরায় গড়ে উঠেছে দিলীপের সাম্রাজ্য

This will close in 5 seconds