হেবা-দান দলিলে কর নিয়ে বিভ্রান্তি, নিবন্ধন বন্ধ

সম্পত্তি নিবন্ধনের আগে নির্ধারিত কর পরিশোধ বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। তবে নতুন আয়কর আইন ও বিধিমালায় হেবা ও দান দলিলে কর পরিশোধের বিষয়ে কিছু অস্পষ্টতা দেখা দেওয়ায় মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এর ফলে এ-সংক্রান্ত জমি বা ফ্ল্যাটের দলিল নিবন্ধন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। সাবরেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান আইনে কর আদায়ের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। হেবার মাধ্যমে কোনো সম্পত্তির মালিক তার ওয়ারিশ বা অন্য কাউকে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন-১৮৮২ অনুযায়ী, কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি স্বেচ্ছায় এবং বিনিময় ছাড়া অন্যের কাছে হস্তান্তর করাকে হেবা বলা হয়। এতে কোনো বাণিজ্যিক লেনদেন থাকে না; বরং এটি পারিবারিক ও ধর্মীয় রীতি এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত।

ঠাকুরগাঁও জেলা নিবন্ধন কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেছেন, অর্থবিল ২০২৬-এর মাধ্যমে আয়কর আইনের ১২৫ ধারা সংশোধন করা হয়েছে। একই সঙ্গে আয়কর বিধিমালা-২০২৬ জারি করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, যেসব সম্পত্তির দলিল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, সেসব ক্ষেত্রে নিবন্ধনের আগে নির্ধারিত কর পরিশোধের প্রমাণ জমা দিতে হবে। কর পরিশোধের ই-চালান বা পে-অর্ডারের কপি ছাড়া নিবন্ধন কর্মকর্তা দলিল নিবন্ধন করবেন না।

আগে হেবা বা দান করা সম্পত্তির ক্ষেত্রে কেবল দান কর প্রযোজ্য ছিল এবং সে অনুযায়ী নিবন্ধন কর্মকর্তারা কর আদায় করতেন। তবে নতুন বিধিমালায় এ বিষয়ে স্পষ্টতা না থাকায় জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। দান করের পাশাপাশি উৎসে কর প্রযোজ্য হবে কি না, নাকি যেকোনো একটি কর দিতে হবে—এ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে আপাতত নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানান রেজাউল করিম। এদিকে আয়কর আইন-১২৫ ধারা ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার ভাষা নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে অনেকের ধারণা, দান করের পাশাপাশি ন্যূনতম ২ শতাংশ বা শতাংশপ্রতি ৫০০ টাকা হারে উৎসে করও দিতে হবে। সিটি করপোরেশন এলাকায় এ হার আরও বেশি; সেখানে ভূমিমূল্যের ৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ৯ লাখ টাকা উৎসে কর হিসেবে দিতে হতে পারে।

তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, হেবা ও দান দলিলে উৎসে কর পরিশোধ করতে হবে না। শুধু আইন অনুযায়ী, প্রযোজ্য দান কর পরিশোধ করলেই হবে। বিধিমালার ভাষাগত অস্পষ্টতার কারণেই এ বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। এনবিআর শিগগির এ বিষয়ে একটি স্পষ্টীকরণ জারি করবে বলে জানা গেছে। নতুন বিধি অনুযায়ী, সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কর নিবন্ধনের আগেই পৃথক ই-চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। এরপর সেই কর পরিশোধের প্রমাণ নিবন্ধনের আবেদনের সঙ্গে দাখিল করতে হবে। এ ছাড়া সম্পত্তির অবস্থান, শ্রেণি ও ধরন অনুযায়ী সারণিভিত্তিক কর নির্ধারণ করা হয়েছে। জমি ও ফ্ল্যাট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারে কর পরিশোধের বিধানও বহাল রয়েছে। কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হেবা বা দান পারিবারিক ও ধর্মীয় রীতিনীতির অংশ। তাই এ ধরনের দলিলে উৎসে কর আরোপের বিষয়টি স্পষ্ট না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য এনবিআরের দ্রুত ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি।