** কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার হিসাব খোলা ও ঋণ নিতে বিআইএন এর শর্ত বাতিল চেয়েছে এবিবি
** মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিআইএন এর বাধ্যবাধকতা বহাল রাখলেও বাস্তবায়নে সময় বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে
** সিএমএস উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বিআইএন বাস্তবায়ন পর্যায়ক্রমে ও ধাপে ধাপে করার সুপারিশ
ভ্যাটের আওতা বাড়াতে চলতি অর্থবছর কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব খোলা ও ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে বিআইএন (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) বা ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা, নতুন ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন ইত্যাদি। তবে বাধ্যতামূলক করার পর প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যাংকও কিছু বেকায়দায় পড়েছে। বিশেষ করে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তারা বেকায়দায় পড়েছে, যার ফলে তাদের ব্যাংক হিসাব খোলা ও ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া করপোরেট ও ব্যবসায়িক গ্রাহকরা সমস্যায় পড়ছে। সব গ্রাহকদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে কিছু ক্ষেত্রে বিআইএন এর বাধ্যতামূলক বাতিল ও কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করার দাবি জানিয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান তথা ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংককার্স বাংলাদেশ লিমিটেড (এবিবি)। সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানকে এই সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এনবিআর বলছে, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় বিষয়টি বাতিলের সুযোগ নেই। বিষয়টি এবিবি-কে জানিয়ে দিয়েছে এনবিআর। এনবিআর সূত্রে এই জানা গেছে।
এনবিআর সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো এবং রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করে অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ভ্যাটের ভিত্তি প্রশস্ত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়াটিকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আরও বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিক কর কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা যাবে এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করবে। পরে কণ্ঠভোটে তা পাস হলে অর্থ বিলে এই বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নতুন আইন অনুযায়ী, অন্যান্য আইনে যাই থাকুক না কেন, ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট কিংবা শর্ট-টার্ম ডিপোজিট (এসটিডি) হিসাব খোলা বা পরিচালনা করার সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিআইএনন নিবন্ধনের প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। ব্যাংক, এনবিএফআই বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) প্রদানকারীদের কাছে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ প্রাপ্তি বা নবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ গ্রহণ এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)-তে কোম্পানির নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও বিআইএনন নিবন্ধনের প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অপরদিকে, এবিবি গত ১৭ আগস্ট এনবিআর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানিয়ে একটি আবেদন করা হয়। যাতে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সিএমএস উদ্যোক্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক বিআইএন এর শর্ত থেকে অব্যাহতি দিতে অনুরোধ করা হয়। একইসঙ্গে এই ধরনের অব্যাহতি বিবেচনাধীন থাকাবস্থায় সিএমএসএমই খাতে ঋণের প্রবাহ অব্যাহত রাখার জন্য বিআইএন বাস্তবায়নের সময়সীমা বৃদ্ধির জন্যও এনবিআরকে অনুরোধ করা হয়। আবেদনে তিনটি বিষয় বিবেচনা করতে অনুরোধ করা হয়েছে। যার মধ্যে প্রথমে রয়েছে- কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে ব্যাংক হিসাব খোলা এবং ঋণ বা ক্রেডিট সুবিধা গ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে বিআইএন নিবন্ধনের প্রমাণ দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি প্রদান করা। দ্বিতীয়ত, এই অব্যাহতির প্রস্তাবটি বিবেচনা ও বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত সিএমএসএমই গ্রাহকদের জন্য বিআইএন দাখিল বা বাস্তবায়নের সময়সীমা যুক্তিসঙ্গতভাবে বৃদ্ধি করা। তৃতীয়ত, সিএমএস (সিএমএস হলো ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট সার্ভিসেস, এটি মূলত করপোরেট ও ব্যবসায়িক গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকের একটি ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় সেবা) উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বিআইএন আনুষ্ঠানিকীকরণের জন্য পর্যায়ক্রমে ও ধাপে ধাপে ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যা ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসায়িক নিবন্ধনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এবং প্রয়োজনে বিদ্যমান ব্যাংকিং রেকর্ডকে সহায়ক প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করবে।
অপরদিকে, এনবিআর থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর এবিবি-কে জবাব দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, আবেদনটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা-৪ এর উপধারা (৩) এর দফা (ক) ও (খ) অনুযায়ী, কোন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কোন ব্যাংক বা এনবিএফআই বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব বা এসটিডি হিসাব খোলা, পরিচালনা এবং এর মাধ্যমে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিআইএন বা তালিকাভুক্তির প্রমাণক উপস্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় এবিবি’র আবেদনটি বিবেচনা করার কোন সুযোগ নেই। চলতি হিসাব ও এসটিডি হিসাবধারী গ্রাহকদের (যেসব প্রতিষ্ঠান বিআইএন নিবন্ধন ছাড়া আগে ব্যাংক হিসাব খুলেছে) দ্রুত ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণের জন্য সকল ব্যাংককে পরামর্শ দিতে এবিবিকে অনুরোধ করা হয়। একইসঙ্গে নতুন হিসাব খোলার ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে বিআইএন যাচাই করে হিসাব খোলার অনুরোধ করা হয়।
এই বিষয়ে এনবিআরের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্যাংক বা লিজিং প্রতিষ্ঠান-সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম। অর্থবিলে আইন আকারে পাশ হয়েছে। ক্ষুদ্র বা বৃহৎ প্রতিষ্ঠান হোক, উত্তম চর্চার অংশ হিসেবে সরকার বিআইএন বাধ্যতামূলক করেছে। ব্যাংক যদি কঠোরভাবে যাচাই করে, তাহলে বিআইএন নিবন্ধন বাড়বে, সঙ্গে ভ্যাটের আওতাও বাড়বে। সেজন্য আমরা ব্যাংককে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বাস্তবায়নের অনুরোধ জানিয়েছি।
এই বিষয়ে এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘এটা আমার কাছে শুধু ব্যাংক হিসাব খোলার শর্ত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, যেহেতু এর সঙ্গে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির প্রশ্নটিও সরাসরি জড়িত। আমরা জানি, BIN বাধ্যতামূলক করার উদ্দেশ্য ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা এবং করজাল বিস্তৃত করা। এর উদ্দেশ্য নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই, বরং তা অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু কোনো ভালো নীতির সুফল পেতে হলে তার বাস্তবায়নও দেশের ব্যবসায়িক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘ব্যাংকার হিসেবে আমরা দেখি যে, একজন উদ্যোক্তার যাত্রা অনেক সময় খুব ছোট জায়গা থেকে শুরু হয়। কেউ ছোট দোকান দেন, কেউ ঘরে বসে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেন, কেউ বা সামান্য পুঁজি নিয়ে প্রথমবারের মতো ব্যবসায় নামেন। শুরুতেই তাঁদের সবার বিআইএন থাকে না। ফলে ব্যাংক হিসাব খোলা কিংবা ঋণ নেওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে বিআইএন বাধ্যতামূলক করাটা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে প্রবেশের দরজাকে তাঁদের জন্য কঠিন করে দেয়। এ কারণেই ব্যাংকিং খাত থেকে আমরা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছিলাম।’
এবিবির চেয়ারম্যান বলেন, ‘এনবিআরও সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করে কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য অব্যাহতি, সিএমএসএমই শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা এবং পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের মতো কয়েকটি বিকল্প বিবেচনার জন্য তুলেছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমরা জানলাম যে সেই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত হয়নি। আমি মনে করি, বিষয়টি আবার বিবেচনার সুযোগ আছে। ছোট উদ্যোক্তাকে আগে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। ব্যাংকে এলে তাঁর লেনদেনের রেকর্ড তৈরি হবে, ঋণ পাওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং ব্যবসাটিও ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক হবে। প্রয়োজনে হিসাব খোলার পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিআইএন নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।’
