** আইসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের নাম আড়াল করা হয়েছে
** নাম প্রকাশ করতে বললো অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার লেনদেনে ভয়াবহ কারসাজির অভিযোগে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) একাধিক কর্মচারী এবং সরকারি কর্মকর্তা জড়িত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এতে আর্থিক খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম, পদবি ও সুস্পষ্ট পরিচয় উল্লেখ করে পুনরায় চিঠি পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, পুঁজিবাজারে শেয়ার কারসাজি কেবল বেসরকারি বিনিয়োগকারী বা বাজারচক্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মচারী এবং সরকারি চাকরিজীবীরাও এ ধরনের অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন বলে সরকারি চিঠিতে উঠে এসেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পুঁজিবাজার-১ শাখা থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক সরকারি চিঠিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। উপসচিব ফারজানা জাহান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারে ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার লেনদেনে কারসাজির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট হিসেবে সমবায় অধিদপ্তর ঢাকার উপনিবন্ধক মো. আবুল খায়ের (হিরো) এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা জড়িত বলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে আইসিবির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের নাম ও পদবি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় তা পুনরায় উল্লেখ করে চিঠি পাঠানোর জন্য কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের এনফোর্সমেন্ট বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনে ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার লেনদেনে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম লেনদেন এবং বাজার প্রভাবিত করার একাধিক আলামত পাওয়া যায়। তদন্তে উঠে আসে, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করে শেয়ারের দাম বাড়ানো হয় এবং পরে উচ্চ দামে শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এসব কার্যক্রম পুঁজিবাজার আইন ও বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তদন্তে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে বিষয়টি উঠে এসেছে, তা হলো এই কারসাজিতে সরাসরি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং একজন কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা জড়িত থাকার তথ্য। সমবায় অধিদপ্তরের উপনিবন্ধক পদে কর্মরত মো. আবুল খায়ের (হিরো) ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার কারসাজির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও পুঁজিবাজারে এ ধরনের অনৈতিক এবং অবৈধ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান দায়িত্ব হলো পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজারকে সহায়তা করা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোরদার করা। সেই আইসিবির ভেতর থেকেই যদি কর্মচারীরা শেয়ার কারসাজিতে জড়িত থাকেন, তাহলে তা পুঁজিবাজারের জন্য বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের চিঠিতে তাই আইসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের নাম, পদবি ও সুস্পষ্ট পরিচয় উল্লেখ করে পুনরায় কমিশনকে চিঠি পাঠানোর কথা বলা হয়েছে, যাতে যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তবে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হলে সংশ্লিষ্টদের পরিচয়, দায়িত্ব ও সংশ্লিষ্টতার মাত্রা পরিষ্কারভাবে জানা প্রয়োজন। সে কারণেই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে পুনরায় বিস্তারিত তথ্য পাঠাতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার লেনদেনে যে ধরনের কারসাজির অভিযোগ উঠেছে, তা পুঁজিবাজারে নতুন নয়। এর আগেও একাধিক কোম্পানির শেয়ারে একই ধরনের কৃত্রিম লেনদেন, দাম বাড়ানো এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। তবে এবার বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে, কারণ এতে সরাসরি সরকারি কর্মকর্তা এবং রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের নাম উঠে এসেছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, এই ঘটনাটি শুধু একটি কোম্পানি বা কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং এটি পুঁজিবাজার তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরের নজরদারির ঘাটতি এবং সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি বাস্তবায়নের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম আরও উৎসাহিত হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কমিশন ইতোমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠিয়েছে এবং নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী যারাই শেয়ার কারসাজিতে জড়িত থাকবেন, তারা সরকারি কর্মকর্তা হোন বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী কিংবা বেসরকারি ব্যক্তি, সবার বিরুদ্ধেই সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ মনে করছে, পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কঠোর বার্তা দেওয়া প্রয়োজন। সেই বার্তার অংশ হিসেবেই ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার কারসাজির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সময়মতো এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে শেয়ার কারসাজি প্রতিরোধে একটি শক্ত বার্তা দেবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মকর্তাদের পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথও খুলে দেবে। তবে তারা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতে অনেক তদন্ত প্রতিবেদন হলেও সেগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। ফলে ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার কারসাজির এই তদন্ত যেন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সে প্রত্যাশাও এখন বাজারসংশ্লিষ্টদের।
সব মিলিয়ে ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার লেনদেন ঘিরে এই সরকারি চিঠি পুঁজিবাজারে একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, বাজার কারসাজির অভিযোগ এলে আর তা শুধু গুজব বা আড়ালে চাপা দেওয়ার সুযোগ নেই। তদন্তে যার নামই আসুক-সে সরকারি কর্মকর্তা হোক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, আইনের আওতায় আনার পথেই হাঁটতে চায় সরকার। এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সেই পদক্ষেপ বাস্তবায়নে প্রশাসনের দৃঢ়তা পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
** ফরচুন সুজের কারসাজি: টাকার পাহাড় গড়লো কারা?
** ফরচুন সুজের কারসাজি, শাস্তির মুখে হিরুরা
** কারসাজি: পরিবারসহ হিরুকে শত কোটি টাকা জরিমানা
