** ই-টিআইএন নিবন্ধনের মতো বিআইএন নিবন্ধন নিতে কারো অনুমোদন লাগবে না
** ১ জুলাই থেকে ভ্যাটের আর হার্ডকপি নেয়া হবে না, রিটার্ন দিতে হবে অনলাইনে
** ব্যাংক হিসাব খুলতে বিআইএন নাম্বার দিতে হবে, পুরনোদের দেওয়া হবে সময়
** সিগারেটের দাম বাড়বে, তামাক খাতের রাজস্ব আদায়ে নীতিমালা থাকবে বাজেটে
ভ্যাটের নিবন্ধন বাড়াতে আগামী অর্থবছর বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হতে পারে। আবার কিছু খাতে ভ্যাট বসানো এবং কিছু খাতে ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়া হতে পারে। যেমন-নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের কথা চিন্তা করে হার্টের রিংয়ের ভ্যাট মওকুফ, যাত্রীদের স্বস্তি দিতে মেট্টোরেলে ভ্যাট অব্যাহতি, কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সরঞ্জামে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। আবার বিলাসী পণ্য হিসেবে দেশীয় মদে স্পেসিফিক ভ্যাট বসানো হতে পারে। ব্যাংকের গ্রাহকদের স্বস্তি দিতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন ও ঋণের উপর আবগারি শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। ভ্যাটের আওতা ও নিবন্ধন বাড়াতে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। সবচেয়ে স্বস্তির খবর হলো, ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়ার ক্ষেত্রে ভ্যাট কমিশনারেট ও কর্মকর্তাদের অনুমোদনের অংশ তুলে দেওয়া হতে পারে। সিগারেটের রাজস্ব না বাড়িয়ে দাম বাড়ানো হতে পারে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিআইএন নিতে ভ্যাট বিভাগের অনুমোদন লাগবে না
এনবিআর সূত্রমতে, বর্তমানে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার (বিআইএন) বা ভ্যাট নিবন্ধন অত্যন্ত জটিল। নিবন্ধন করতে হলে ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট অফিসে যেতে হয়। আবেদন করার পরও সর্বনিম্ন ৩দিন থেকে সর্বোচ্চ একমাস সময় লেগে যায়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও কর্মার্শিয়াল বা ট্রেডার্স-এই দুই ধরনের নিবন্ধন দেওয়া হয়। নিবন্ধন প্রক্রিয়াও বেশ জটিল। প্রথমে একজন ব্যবসায়ী এক গাদা কাগজ দিয়ে ভ্যাট অনলাইনে নিবন্ধনের আবেদন করেন। এই আবেদন সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটে যায়। কমিশনারেটের প্রোগ্রামার সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কার্যালয়ে পাঠায়। সেখান থেকে সার্কেলে যায়। সার্কেল প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা, উৎপাদনসহ সব যাচাই করে প্রতিবেদন দিলে তা আবার বিভাগীয় কার্যালয়, কমিশনারেট হয়ে ভ্যাট অনলাইনে যায়। এতে প্রতিটি অফিসে কর্মকর্তাদের অনুমোদন লাগে। তবে আগামী বাজেটে বিআইএন নিবন্ধন সহজ করা হচ্ছে। বর্তমানে একজন করদাতা ঘরে বসেই ই-টিআইএন নিবন্ধন করতে পারেন। আগামী বাজেটে বিআইএন নিবন্ধন বাড়ানো ও প্রক্রিয়া সহজ করতে অনুমোদনের অংশ তুলে দেওয়া হচ্ছে। এতে যেকোন প্রতিষ্ঠান নিজেরাই ই-টিআইএনর মতো বিআইএন নিবন্ধন করতে পারবেন।
হার্টের রিং সরবরাহের উপর ১০ শতাংশ ভ্যাট থাকছে না
এনবিআর সূত্রমতে, দেশে হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হার্টের রিং বা স্টেন্টের দাম বিভিন্ন ব্র্যান্ড ও দেশভেদে ভিন্ন হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে হার্টের রিংয়ের সর্বনিম্ন দাম ১৪ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে সরকার কিছু নির্দিষ্ট ধরনের রিংয়ের দাম পুনঃনির্ধারণ করেছে, যেখানে দাম ৩ হাজার টাকা থেকে ৮৮ হাজার টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে। তবে দামের সঙ্গে কর, ভ্যাট ও বিভিন্ন চার্জ বা কমিশন যোগ করলে রিংয়ের দাম বেড়ে যায়। ফলে গরীব বা মধ্যবিত্তরা এই রিংয়ের খরচ বহন করতে পারে না। দেশে প্রতি বছর অন্তত ৪৫ থেকে ৪৫ হাজার করোনারি স্টেন্ট প্রয়োজন হয়। নিবন্ধিত ৩১টি কোম্পানি করোনারি স্টেন্ট আমদানি করে। আমদানি করা মোট স্টেন্টের ৫০ শতাংশই অ্যাবট, বোস্টন সায়েন্টিফিক ও মেডট্রনিক আমদানি করে। এই রিং হাসপাতালে সরবরাহ করার ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ যোগানদার ভ্যাট রয়েছে। গরীব, অসহায় ও মধ্যবিত্ত রোগীদের কথা চিন্তা করে আগামী অর্থবছর রিংয়ের সরবরাহের উপর এই ১০ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।
কেরুর মদে স্পেসিফিক ভ্যাট বসছে
এনবিআর সূত্রমতে, দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড মদ তৈরি করে। এই মদে কোন ধরনের ভ্যাট নেই। শুধুমাত্র মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মাদক শুল্ক বা এক্সাইজ ডিউটি দিতে হয়। কোম্পানিটি বর্তমানে বেশ লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। সেজন্য কেরুর মদে আগামী অর্থবছর স্পেসিফিক ভ্যাট বসানোর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। লিটার প্রতি এই ভ্যাট বসানো হতে পারে। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় এই কোম্পানির বিক্রি ভালো। এত বছর লাভজনক অবস্থায় ছিলো না। বর্তমানে লাভজনক অবস্থায় থাকায় আগামী বাজেটে মদের উপর লিটার প্রতি স্পেসিফিক ভ্যাট বসানো হতে পারে। তবে লিটারে ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা ভ্যাট বসানো যায় কিনা, এনবিআর তা বিবেচনা করছে। রাষ্ট্রীয় এই কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেকর্ড ১৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা প্রায় নয় দশকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বিদেশি মদ আমদানিতে কঠোর বিধিনিষেধ ও চড়া মুনাফার সুবাদে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই ডিস্টিলারিটি দারুণ সাফল্য পেয়েছে, যা কোম্পানিটির মুনাফা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
ব্যাংক হিসাব খুলতে বিআইএন বাধ্যতামূলক, পুরনো প্রতিষ্ঠানের জন্য থাকবে নির্দেশনা
এনবিআর সূত্র বলছে, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা ব্যাংক হিসাব খুলতে বিআইএন সনদ দেয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন না থাকায় সঠিকভাবে ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। ভ্যাটের নিবন্ধন ও ভ্যাট আদায় বাড়াতে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে নিবন্ধন নেয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। অর্থাৎ ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া ব্যাংকে কোনো ব্যবসায়িক হিসাব খোলা যাবে না। কর্মকর্তারা বলছেন, ভ্যাট সনদ ছাড়া ব্যাংক হিসাব খোলা যাবে না। এরপর প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে বিআইএন নিবন্ধন করবে। নিবন্ধন প্রক্রিয়াও আমরা সহজ করে দিচ্ছি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভ্যাট সনদের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে হিসাব খুলবেন। আবার যারা ভ্যাট নিবন্ধন না নিয়ে হিসাব খুলেছেন, তাদের বিষয়ে এনবিআর থেকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। হয়ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধন নিতে নির্দিষ্ট একটি সময় দেওয়া হবে। এর মধ্যে নিবন্ধন না নিলে হিসাবে লেনদেন স্থগিত হয়ে যেতে পারে।
সিগারেটের দাম বাড়ানো হবে, আসতে পারে বিধিমালা, হবে কিউআর কোড
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় তামাক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে—৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। ভারতে এ হার ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ। ব্যবহার বেশি হলেও তামাকের দাম সস্তা, যার ফলে সরকার তামাক খাত বিশেষ করে সিগারেট থেকে কাঙ্খিত রাজস্ব পায় না। আবার সিগারেট পেপার, মেশিনারিজ ও সিগারেট তৈরির অন্যান্য উপাদান আমদানির ক্ষেত্রেও শুল্ককর ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণাসহ রাজস্ব ফাঁকির নানান অভিযোগ রয়েছে। তার সঙ্গে দেশে অবৈধ ও নকল সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুলের বিশাল বাজার রয়েছে। এই অবৈধ বাজারের কারণে সরকার প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। কিছু কিছু কোম্পানি নিবন্ধন ছাড়াই তামাক বা সিগারেটের ব্যবসা করে। তামাক খাত থেকে সঠিকভাবে রাজস্ব আদায় করতে চায় সরকার। সেজন্য তামাক খাত নিয়ে বাজেটে একটি পূর্ণাঙ্গ বিধিমালার ঘোষণা আসতে পারে। এছাড়া অবৈধ ও নকল সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সিগারেট কোম্পানি থেকে সঠিক রাজস্ব আদায়ে সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর কোড করার চিন্তা করছে এনবিআর। তবে আগামী বাজেটে সিগারেটে রাজস্ব বাড়ানো হবে না, সিগারেটের দাম বাড়ানো হতে পারে। প্যাকেট প্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এনবিআর। এর ফলে আগামী অর্থবছর তামাক খাত বিশেষ করে সিগারেট খাত থেকে অতিরিক্ত ৫-৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হবে।
মেট্রোরেলে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে
এনবিআর সূত্রমতে, দ্রুতগামী, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, সময় সাশ্রয়ী, বিদ্যুৎচালিত, পরিবেশবান্ধব ও দূরনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় জনগণের মাঝে প্রতিনিয়ত মেট্টোরেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। যাত্রীদের কথা চিন্তা করে এনবিআর ২০২৩ সাল থেকে মেট্টোরেলের সেবার উপর বিশেষ করে টিকেটের উপর ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে আসছে। ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রীদের স্বস্তি দিতে আগামী বাজেটে মেট্রোরেলকে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে।
** ৫০ পণ্য-সেবায় বাড়ছে ভ্যাট-শুল্ক
** সম্পদ কর চালু হচ্ছে, বাড়বে তামাক পণ্যের দাম
** বাজেটে ১ শতাংশ সম্পদ কর চালুর পরিকল্পনা
** বাজেটে রপ্তানি প্রণোদনার ওপর কর ২০% করার চিন্তা
** বাজেটে ২.৩৫ লাখ কোটি ঘাটতি, চাপে অর্থনীতি
** আগামী ৭ জুন সংসদের বাজেট অধিবেশন বসবে
** বাজেটে কর-ছাড় ও ভর্তুকি তুলে দেওয়ার পরামর্শ
** বাজেটে বিড়ি শিল্পে শুল্ক না বাড়ানোসহ ৫ দাবি
** আসছে ৯,৩০,০০০ কোটি টাকার বাজেট
** ‘বাজেটে ব্যবসায়ীদের ওপর খড়গ নামবে না’
** এমন বাজেট দেওয়া ঠিক হবে না যাতে মূল্যস্ফীতি বাড়ে
