হামের টিকার কার্যকারিতা যাচাইয়ে গবেষণা

হাম-রুবেলার (এমআর) টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হয়, যা তাদের হাম ও রুবেলা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়। সাধারণত টিকা নেওয়ার ২–৪ সপ্তাহের মধ্যে এই প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর প্রথমে ৫ বছর বয়সের নিচের শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছিল। তবে পরবর্তীতে দেখা যায়, ধীরে ধীরে বড় বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। এটি সাধারণত তখনই ঘটে, যখন কোনো জনগোষ্ঠীর একটি অংশ টিকা না নেওয়া থাকে বা নির্ধারিত ডোজ সম্পূর্ণ না করে। ফলে ভাইরাসটি সহজে ছড়িয়ে পড়ে এবং বয়সভিত্তিক সীমাবদ্ধতা ভেঙে বড়দের মধ্যেও সংক্রমণ দেখা দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে দুই ডোজ এমআর টিকা অত্যন্ত জরুরি। একটি ডোজ নিলে আংশিক সুরক্ষা পাওয়া গেলেও পূর্ণ সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সব ডোজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন। তাই শিশুদের সময়মতো এমআর টিকা দেওয়া এবং টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং ভবিষ্যতে বড় আকারে ছড়িয়ে পড়া রোধ করা সম্ভব হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাম এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বর্তমানে আক্রান্তদের বড় অংশই টিকাবঞ্চিত অথবা অপুষ্টিতে ভুগছে। তিনি বলেন, টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ভুল ছিল এবং প্রায় ৪৬ লাখ শিশু কর্মসূচির বাইরে রয়ে গেছে। তিনি জানান, হাম পরিস্থিতি পর্যালোচনায় নতুন বৈঠক করা হবে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার মূলত টিকাদান কর্মসূচির ওপর নির্ভর করেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু রোগী শনাক্তকরণ, আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতাল প্রস্তুতি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিবিড় নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পদক্ষেপে ঘাটতি ছিল। হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ে জাতীয় কমিটির (এনভিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, শুধু টিকাদান নয়, কভিড-১৯ মহামারির সময়ের মতো সামাজিক সংক্রমণ প্রতিরোধে শুরু থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। জ্বর দেখা দিলে শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা, হাত ধোয়ার অভ্যাস, মাস্ক ব্যবহার এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মতো উদ্যোগ যথাযথভাবে নেওয়া হয়নি।

টিকা নিয়েও হামে আক্রান্ত

রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন আরাফাত সাজিদের বয়স তিন বছর দুই মাস। ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে নিয়ম অনুযায়ী হাম-রুবেলার (এমআর) টিকা নেওয়ার কথা থাকলেও সে সময় তার টিকা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি জ্বর, সর্দি ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা জানান, এটি হামের লক্ষণ এবং সময়মতো টিকা না নেওয়ার কারণেই সে সংক্রমিত হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, অনেক অভিভাবকের মধ্যে এখনো টিকা নিয়ে ভুল ধারণা বা অবহেলা রয়েছে। অথচ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত সময়ে এমআর টিকা দেওয়া হলে হাম ও রুবেলা—দুটি মারাত্মক রোগ থেকেই শিশুকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। তারা আরও বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার এই সময়ে প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।

একইভাবে ১০ মাস বয়সী হাফসাও জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এমআর টিকা পেয়েছিল। কিন্তু জ্বর, সর্দি ও শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। চিকিৎসকেরা জানান, টিকা নেওয়ার পরও কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে সময় লাগে বা প্রত্যাশিত সাড়া নাও মিলতে পারে। তাই সংক্রমণের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়াতে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সব ডোজ সম্পন্ন করা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, যে কোনো টিকাদান কর্মসূচির পর টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়নে গবেষণা ও নজরদারি (পোস্ট মার্কেটিং সার্ভিলেন্স) পরিচালনা একটি বিশ্বব্যাপী স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, আইসিডিডিআর,বি– যে কোনো প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের মূল্যায়ন করতে পারে। এতে দেখা হয়, টিকা নেওয়ার পর কত শতাংশ মানুষের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি কতটা কার্যকর হয়েছে। শুধু টিকাদান নয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কৌশল এখন সময়ের দাবি।

এনভিসি (জাতীয় টিকাদান বিষয়ক পরামর্শক কমিটি)–এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়স হওয়ার আগেই তারা হামে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। ফলে তারা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকা নিতে পারছে না বা টিকা নিলেও কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা তৈরি হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, হামের সংক্রমণ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় আশপাশে সংক্রমণ থাকলে অল্প বয়সী শিশুরাও ঝুঁকিতে পড়ে। তাই শুধু নির্ধারিত বয়সে টিকা দিলেই যথেষ্ট নয়, বরং সময়মতো সব ডোজ সম্পন্ন করা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে বাড়তি সতর্কতা নেওয়াও জরুরি।