জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রথম সচিব (কর) কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ঘুষগ্রহণ, বদলি বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, এসব অবৈধ সম্পদ আত্মীয়-স্বজনের নামে লুকানোর জন্য তিনি প্রায় ৭০০টি ব্যাংক হিসাব খুলেছিলেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ১৯টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৮৭টি হিসাব থেকে ইতোমধ্যে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল, তাঁর স্ত্রী ও স্বজনদের নামে থাকা বিপুল সম্পদ জব্দ করেছে। এসবের মধ্যে রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট, ৮৭টি ব্যাংক হিসাব ও সঞ্চয়পত্র—যার মোট মূল্য শত কোটি টাকার বেশি। দুদকের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজের আবেদনের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর বিশেষ জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন এই সম্পদ জব্দের আদেশ দেন।
দুদকের তদন্তে জানা গেছে, ফয়সাল নিজের নামে ফ্ল্যাট ও প্লট কেনার পাশাপাশি স্ত্রী আফসানা জেসমিন, শ্বশুর আহম্মেদ আলী, শাশুড়ি মমতাজ বেগমের নামেও বিপুল সম্পদ গড়েছেন। এছাড়া তাঁর ভাই কাজী খালিদ হাসান, শ্যালক আফতাব আলী, শ্যালিকা ফারহানা আফরোজ, খালাশাশুড়ি মাহমুদা হাসান, মামাশ্বশুর শেখ নাসির উদ্দিন এবং আত্মীয় খন্দকার হাফিজুর রহমান ও রওশন আরা খাতুনের ব্যাংক হিসাবেও কোটি কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেছে দুদক।
দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, কাজী আবু মাহমুদ ফয়সালের বিরুদ্ধে ২০২২ সাল থেকে অনুসন্ধান শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে তার শতকোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়। এসব সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে তার নামে আরও বিপুল পরিমাণ সম্পদের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু এখনো অনুসন্ধান চলমান, তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার মোট কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তা বলা যাবে না। এই কর্মকর্তা আরও জানান, এনবিআর কর্মকর্তা ফয়সাল বিদেশে কয়েকশ কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করতে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ছাড়াও অন্যান্য সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে প্রাপ্ত তথ্যের বিচার-বিশ্লেষণ চলছে।
দুদক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ফয়সালের নামে ৬টি ব্যাংক হিসাবে ৫ কোটি ২১ লাখ টাকা জমা হয়। তার স্ত্রী আফসানা জেসমিনের ৫টি ব্যাংক হিসাবে জমা হয় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ফয়সালের শ্বশুর আহম্মেদ আলী একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ও শাশুড়ি মমতাজ বেগম গৃহিণী হলেও তাদের ব্যাংক হিসাবে সবচেয়ে বেশি লেনদেনের সন্ধান পায় দুদক। দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, ফয়সালের শ্বশুর ও শাশুড়ির নামে ১৮টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এসব ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১৯ কোটি টাকা জমা হয় এবং পরে এর বড় অংশ উত্তোলন করা হয়। ফয়সালের শ্বশুর আহম্মেদ আলীর ৮টি ব্যাংক হিসাবে জমা হয় ১১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। তার নামের ৮টি ব্যাংক হিসাবের দুটি ২০০৭ ও ২০১০ সালে খোলা এবং বাকিগুলো খোলা হয় ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে। ফয়সালের শাশুড়ি মমতাজ বেগমের নামে ১০টি ব্যাংক হিসাবে ৭ কোটি টাকা জমা হয়। তার নামের ব্যাংক হিসাবগুলোর মধ্যে একটি ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে খোলা হয়। এদিকে ফয়সালের শ্যালক আফতাব আলীর ৬টি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা জমার তথ্য পেয়েছে দুদক। তাদের নামে বিভিন্ন সময়ে এসব টাকা জমা হয়েছে। পরে এর বড় অংশই তুলে নেওয়া হয়েছে। ফয়সাল, তার স্ত্রী, শ্বশুর ও স্বজনদের নামে ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রও রয়েছে।
রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী সড়কের ৮৫ কাঠার ওপর নির্মিত রূপায়ণ স্বপ্ননিলয় ভবনের একটি ফ্ল্যাটে সপরিবারে বসবাস করেন ফয়সাল। পার্কিংসহ ৩ হাজার ২২৮ বর্গফুটের ফ্ল্যাটটি গত বছরই শ্বশুর আহম্মেদ আলীর নামে কিনেছেন। এ ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য প্রায় ছয় কোটি টাকা। যদিও দলিলমূল্য দেখানো হয়েছে ৯৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা।২০২০ সালে রাজধানীর ভাটারার কাঁঠালদিয়া মৌজার বসুন্ধরা এলাকায় ফয়সাল তার স্ত্রী আফসানা জেসমিনের নামে ৫ কাঠার একটি প্লট কেনেন। সাড়ে তিন বছর আগে ওই জমির দলিলমূল্য ১৮ লাখ ১৭ হাজার টাকার দেখানো হলেও এখন সেই জমি কাঠা প্রতিই এক কোটি টাকার কাছাকাছি। বসুন্ধরার আবাসিক প্রকল্পের মধ্যে ফয়সাল নিজের নামে আড়াই কাঠা জমি কেনেন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ফয়সাল নিজ নামে আলাদা ৪টি দলিলে জমি কিনেছেন। এসব সম্পদের দলিলমূল্য দেখানো হয় ৪০ লাখ টাকার বেশি।
অন্যদিকে শাশুড়ি মমতাজ বেগমের নামে ২০২২ সালে রাজধানীর আফতাবনগরের ইস্টার্ন হাউজিংয়ে ১০ কাঠার একটি প্লট কিনেছেন ফয়সাল। এই প্লটের দলিলমূল্য ৫২ লাখ টাকা হলেও বর্তমান বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি। ঢাকা মহানগর বিশেষ জজ আদালতে দায়িত্বরত দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ফয়সালের যেসব সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি ৩৩ দপ্তরে আদেশের অনুলিপি পাঠিয়েছেন আদালত। এ বিষয়ে বাংলা ও ইংরেজি দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিতে দুদককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই আইনজীবী জানান, আদালত তার আদেশে ক্রোককৃত ফ্ল্যাট-প্লট-জমিসহ স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর যাতে না করা যায় সেই ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে সেগুলো থেকে কোনো অর্থ উত্তোলন করা যাবে না, তবে জমা করা যাবে বলে আদেশ দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, মাহমুদ ফয়সাল ২০০৫ সালে বিসিএস (কর) ক্যাডারে সহকারী কর কমিশনার হিসেবে যোগ দেন। তিনি বর্তমানে এনবিআরের আয়কর বিভাগের প্রথম সচিব (ট্যাক্সেস লিগ্যাল অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন।
ছাগলকাণ্ডে দেশজুড়ে আলোচিত এনবিআরের সদ্যবিদায়ী সদস্য মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের মধ্যেই ফয়সালের সম্পদ জব্দের চাঞ্চল্যকর খবর এলো। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ১৫ লাখ টাকার ছাগল কিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুবক মুশফিকুর রহমান ইফাত ভাইরাল হওয়ার পর পরিচয় খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে তার বাবা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট মতিউর। এরপর গত ২৩ জুন মতিউরকে ট্রাইব্যুনাল থেকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সোনালী ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকেও অব্যাহতি দেওয়া হয়। ওই দিনই তার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি করে দুদক।
