মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশের জাহাজ চলাচলে ছাড় দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ও বিশেষ অনুমোদিত দেশের জন্য এ জলপথ উন্মুক্ত রাখা হবে। ইরানের এ তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের নাম রয়েছে। বিশ্বে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বড় অংশ এই সংকীর্ণ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকেই প্রণালিটিতে কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে তেহরান। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ—পশ্চিমা গণমাধ্যমের এমন দাবি সঠিক নয়। তিনি জানান, বিভিন্ন দেশের শিপিং কোম্পানি নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আরাগচি বলেন, যেসব দেশকে ইরান ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ হিসেবে বিবেচনা করে বা বিশেষভাবে অনুমোদন দিয়েছে, তাদের জাহাজের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করছে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী। তিনি আরও জানান, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে এ সুবিধা পেয়েছে এবং গত কয়েক রাতে ভারতের দুটি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশও এই তালিকায় রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে চলাচল করছে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যারা এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িত বা শত্রুপক্ষ হিসেবে বিবেচিত, তাদের জাহাজ এই পথে চলতে দেওয়া হবে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং যুদ্ধের নেপথ্যে ভূমিকা রাখা নির্দিষ্ট কিছু উপসাগরীয় দেশের জাহাজ চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আরাগচি বলেন, ‘আমরা এখন যুদ্ধাবস্থায় আছি। এই অঞ্চলটি এখন একটি যুদ্ধক্ষেত্র। তাই শত্রু বা তাদের মিত্রদের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে অন্যদের জন্য এটি খোলা থাকছে।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানগামী একটি কনটেইনার জাহাজকে হরমুজ প্রণালিতে আটকে দেয় ইরান। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) শারজা থেকে করাচিগামী ‘সেলেন’ নামে জাহাজটির ট্রানজিট অনুমতি না থাকায় সেটিকে মাঝপথ থেকেই ঘুরিয়ে দেয় ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ইরান বর্তমানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে এই প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে। লয়েডস লিস্টের তথ্যমতে, স্বাভাবিক সময়ে এই পথে দৈনিক ১২০টির মতো জাহাজ চলাচল করে। কিন্তু ১ থেকে ২৫ মার্চের মধ্যে এ সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমে গেছে।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কেপলারের মতে, এই সময়ে মাত্র ১৫৫টি জাহাজ এই পথ দিয়ে পার হয়েছে, যার মধ্যে ৯৯টি ছিল তেল ও গ্যাস পরিবাহী ট্যাংকার। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি–সংকটের কারণে বিমান সংস্থা থেকে শুরু করে সুপারমার্কেট—সবখানেই খরচ বাড়ছে এবং সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। অনেক সরকার এখন করোনা মহামারির সময়কার মতো জরুরি সহায়তা দেওয়ার কথা ভাবছে।
