সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি আমদানিতে বড় শুল্ক ছাড়

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক-কর ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিষয়ে একাধিক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে এ খাতের কিছু যন্ত্রপাতি আমদানিতে সর্বোচ্চ ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-কর আরোপ রয়েছে। তবে নতুন বাজেটে তা কমিয়ে ১৫ শতাংশের নিচে নামানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিনিয়োগ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং শিল্পকারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও সহজ হবে। শিল্প-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের শুল্ক কমানো হলেও ডিসি কেবল, ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম, মাউন্টিং স্ট্রাকচার ও কন্ট্রোল সিস্টেমের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণে উচ্চ কর বহাল রয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয় বেশি থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট বিদ্যা অমৃত খান বলেছেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন বাধ্যতামূলক হলেও দেশে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ব্যয় এখনো বেশি, তাই আসন্ন বাজেটে শুল্ক কমানো জরুরি। তিনি জানান, বর্তমানে সোলার প্যানেলের ওপর মোট শুল্ক-কর ৩৭ থেকে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত, যা রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে ব্যবসায়ীরা বাজেট প্রস্তাবে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ডিসি কেবল ও ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেমের শুল্ক ১ শতাংশে নামানোর দাবি জানিয়েছেন। যদিও সরকার ২০২৫ সালে কিছু সংস্কারের মাধ্যমে সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের শুল্ক ১ শতাংশে নামিয়েছে, তবে অন্যান্য যন্ত্রাংশে উচ্চ কর বহাল থাকায় প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের মত।

এদিকে, সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর সুবিধা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে আয়কর অব্যাহতিরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও উৎপাদনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২৫ সালের ৩০ জুন থেকে অর্জিত আয়ের ওপর কর অব্যাহতি পাবে, যা কার্যকর হবে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে। এ বিষয়ে শর্ত অনুযায়ী, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প স্থাপন, নেট মিটারিং অনুমোদন এবং বিদ্যুৎ বিক্রির ক্ষেত্রে পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (পিপিএ) বাধ্যতামূলক থাকবে।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফা আল মাহমুদ বলেছেন, ‘কর সুবিধা কার্যকর হলে শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুৎ দ্রুত বিস্তার পাবে এবং বিদ্যুৎ ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ দুই-ই কমবে।’ ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেছেন, শুধু কর ছাড় নয়, নেট মিটারিং ও গ্রিড সংযোগ প্রক্রিয়াও সহজ করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংক অর্থায়ন বাড়াতে হবে, যাতে এসএমই খাতও উপকৃত হয়।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে সরকারের সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের মতে, শুল্ক-কর কমানো হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ দ্রুত বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা হ্রাস পাবে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।