সোনা পাচারের নেপথ্যে ৫০ গডফাদার

চলতি বছরের ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে ঢাকাগামী বিমান বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট থেকে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা মূল্যের ১৫৩টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। পরদিন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে বিমানবন্দর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। তবে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তে এখনো কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি পুলিশ। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই ফ্লাইটে ৪৩৯ জন যাত্রী এবং প্রায় ২০ জন বিমানবালা, টেকনিশিয়ান ও কেবিন ক্রু ছিলেন। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করা তদন্তকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে বিমানের সাত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। ফলে বিপুল পরিমাণ এই অবৈধ সোনার প্রকৃত হোতাকে শনাক্ত করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে, গত বৃহস্পতিবার রাতে দুবাই থেকে ঢাকাগামী একটি বিমানের কার্গো হোল থেকে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা মূল্যের ১৬০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনাতেও আগের মতোই বিমানবন্দর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, সোনাগুলো কার্গো হোল থেকে উদ্ধার হওয়ায় কোনো সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাহক শনাক্তের সুযোগ নেই। আর বাহককে চিহ্নিত করা না গেলে চোরাচালানের মূল হোতা বা গডফাদারদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু এই দুই ঘটনাই নয়, বিমানবন্দর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া বেশির ভাগ সোনার চালানের ক্ষেত্রেই তদন্ত শেষ পর্যন্ত অগ্রগতি পায় না।যেসব ঘটনায় বাহকসহ সোনা জব্দ হয়, সেখানে কখনো কখনো কিছু নাম সামনে এলেও তদন্ত সাধারণত সেখানেই থেমে যায়। অভিযোগপত্রে এসব নাম উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না।

জানা গেছে, সোনা পাচারের বিগ ফিশেরা বিদেশে স্থায়ীভাবে সপরিবার বসতি গেড়েছেন। দেশে না আসায় তাদের আইনের আওতায় আনা যায় না। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিমানবন্দরের অশুভ চক্রের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার সোনা পাচার করছেন। পুলিশ সূত্র জানিয়েছেন, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা এ চক্রে অর্ধশত মাফিয়া রয়েছেন। আর মাঝারি চোরাকারবারি রয়েছেন ২ শতাধিক। যারা বিভিন্ন পন্থায় দেশে সোনা পাচার করছেন। বিমানবন্দর থানা সূত্র জানিয়েছেন, ২০১৬ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরে সোনা চোরাকালানসংক্রান্ত ৬৯৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ২৭টি। মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৪৭টির। অন্য ৫০টির মধ্যে ৪২টি থানা পুলিশ ও ৮টি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে। তবে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার সোনার চালানের অভিযোগপত্র দেওয়া বেশির ভাগ মামলাতেই মাফিয়াদের খোঁজ মেলেনি বলে জানা গেছে।

একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমানে সক্রিয় সোনা পাচার চক্রের মধ্যে মালয়েশিয়াভিত্তিক নরসিংদীর আনোয়ার, শরীয়তপুরের হান্নান শিকদার ও মুন্সিগঞ্জের জুমন এবং সৌদিভিত্তিক কুমিল্লার সাইফুল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া দুবাইয়ে অবস্থানরত শওকত, মোস্তফা, নোমান ও নজরুলের নামও পুলিশের তালিকায় রয়েছে। বিদেশে অবস্থানকারী এ ধরনের প্রায় অর্ধশত মাফিয়া নিজ নিজ এলাকায় আলাদা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে বিভিন্ন জুয়েলারির দোকানের মাধ্যমে সোনা বাজারজাত করছে। পাশাপাশি কেউ কেউ এসব সোনা প্রতিবেশী দেশেও পাচার করছে। কাস্টমস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৯০২ কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। তবে নিয়মিত জব্দ অভিযান চললেও অজ্ঞাত কারণে এই চোরাচালান কার্যক্রম থামছে না।

মুয়াল্লিমদের দলে ভেড়াচ্ছে চক্র

গত বছরের ২২ নভেম্বর শাহজালাল বিমানবন্দরের ১ নম্বর ক্যানোপি সংলগ্ন এপিবিএন অফিসের পাশ থেকে সৌদিফেরত যাত্রী নূরুল আলমকে ১ কেজি ৩০০ গ্রাম স্বর্ণালংকারসহ গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তার গলায় ঝোলানো হজের কাপড়ের ব্যাগ, পরনের জুব্বা ও পাজামার ভেতরে গয়নাগুলো লুকানো ছিল। এই ঘটনার তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, সৌদি থেকে ফেরা হজ ও ওমরাহ যাত্রীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে সোনা পরিবহনে যুক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে মুয়াল্লিমদের একটি বড় অংশ এতে জড়িয়ে পড়ছে। ধর্মীয় পোশাক ও অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এসব যাত্রী অবৈধ সোনা দেশে নিয়ে আসছেন। মুয়াল্লিমদের নেতৃত্বে একসঙ্গে অনেক যাত্রী চলাচল করায় বিমানবন্দরে তাদের তেমন বাধার সম্মুখীন হতে হয় না বলেও জানা গেছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন মুয়াল্লিমের নাম তদন্তে উঠে এসেছে এবং তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।

তদন্তে নাম এলে ধরা পড়বেই

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, যেসব সোনার চালান বাহকসহ জব্দ হয়, সেসব ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসা গডফাদারদের নাম অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পাশাপাশি তাদের তথ্য ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছেও সংরক্ষিত থাকে, ফলে তারা দেশে প্রবেশ করলেই গ্রেপ্তারের মুখে পড়বেন। বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, যেসব দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা বেশি, সেসব জায়গায় এই চক্রের তৎপরতাও বেশি দেখা যায়। প্রতিনিয়তই বিমানবন্দরে সোনা জব্দ হচ্ছে। এর পেছনে শুধু গডফাদারই নয়, বিমানবন্দরভিত্তিক কোনো সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ধরনের চক্রে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি জানান। এদিকে, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, সোনা চোরাচালান প্রতিরোধে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।