সোনাদিয়ায় বনভূমি ধ্বংস করে চলছে কটেজ নির্মাণ

দ্বীপের নাম সোনাদিয়া। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মোড়া এই দ্বীপে যেন সবই আছে—নেই শুধু প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার মতো মানুষের দায়বদ্ধতা। সোনার চেয়েও দামী প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই দ্বীপ। একসময় ছিল জীববৈচিত্র্যের অনন্য আশ্রয়স্থল। অপরূপ সৌন্দর্য, নৈসর্গিক পরিবেশ আর সমুদ্রঘেরা নিস্তব্ধতা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য তৈরি করেছিল স্বপ্নের ঠিকানা।কিন্তু সেই স্বর্গ এখন দখলদারদের লোভের শিকার। মনোপলি বাণিজ্য, সীমাহীন লালসা, ম্যানগ্রোভ বন ও ঝাউবন ধ্বংস এবং বালিয়াড়ি দখলের মাধ্যমে দ্বীপটির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য ধ্বংসের মুখে। রাতারাতি কোটিপতি থেকে বিলিয়নিয়ার হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে একদল প্রভাবশালী গোষ্ঠী। ভূ-তত্ত্ববিদ ও পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আবদুল হক সতর্ক করে বলেন, এখনই এই অপতৎপরতা বন্ধ না করা গেলে পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্প বিকাশের সরকারি লক্ষ্য মুখ থুবড়ে পড়বে।

সোনাদিয়া দ্বীপের ইতিহাস ও অবস্থান

সোনাদিয়া বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নে অবস্থিত। মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত প্রায় ৯ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে জেগে ওঠা ভূমি। প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বসবাস এখানে। প্রায় ১৩০ থেকে ১৫০ বছর আগে বসতি গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের মতে, প্রয়াত আসাদ আলী ছিলেন দ্বীপের আদি বিশিষ্ট ব্যক্তি; তাঁর পূর্বপুরুষদের হাত ধরেই সোনাদিয়ায় আবাদ ও বসতি শুরু হয়। মহেশখালী মূল দ্বীপ থেকে একটি সংকীর্ণ খাল সোনাদিয়াকে পৃথক করেছে। কক্সবাজার শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। একসময় দ্বীপটিতে ছিল— ৫৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৫২ প্রজাতির শামুক, ২১ প্রজাতির কাঁকড়া, ৯ প্রজাতির চিংড়ি, ২০৭ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ১২ প্রজাতির উভচর, ১৯ প্রজাতির সরীসৃপ, ২০৬ প্রজাতির পাখি।
Sonadia Island 3

পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা

পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার সোনাদিয়াকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ)’ ঘোষণা করে। আইন অনুযায়ী এখানে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, গাছ কাটা বা পরিবেশের ক্ষতিকর বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন স্থানীয়দের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দ্বীপজুড়ে চলছে কটেজ ও রিসোর্ট নির্মাণের মহোৎসব। বন বিভাগের নীরবতার সুযোগে অন্তত ৪৫টি কটেজ ও রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে, আরও কয়েকটি নির্মাণাধীন। তিনতলা পর্যন্ত অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে। তাদের আশঙ্কা— দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সোনাদিয়ার ঝাউবন সম্পূর্ণ উজাড় হয়ে যাবে।

প্যারাবন কেটে চিংড়ি ঘের তৈরির প্রতিযোগিতা

বালিয়াড়ি দখল এবং বনভূমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণে সক্রিয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। স্থানীয়দের দাবি, এই সিন্ডিকেটে বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিলেমিশে একাকার। এই ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা নব্বইয়ের দশকে হলেও বর্তমানে তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সোনাদিয়ার ঘটিভাঙ্গা, তাজিয়াকাটা ও বড়দিয়ার ঘন বনাঞ্চল এখন প্রায় বিলীন।
Sonadia Island 5

মামলায় ছোটরা আসামী, বড়রা অধরা

গত ২ এপ্রিল বন বিভাগ প্যারাবন ধ্বংসের ঘটনায় ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করে। স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ— অভিযুক্তদের অধিকাংশই জুনিয়র রাজনৈতিক কর্মী। প্রকৃত বনখেকো মাত্র ৫–৭ জন। তাদের দাবি, শতাধিক ভিআইপি ও প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি রহস্যজনকভাবে মামলার বাইরে রয়েছেন। পরিবেশবাদীদের মতে, দুর্বল মামলা দিয়ে সোনাদিয়া রক্ষা সম্ভব নয়; প্রশাসন, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত কঠোর আইনি পদক্ষেপ জরুরি।

কচ্ছপ হারাচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিবেশকর্মী জানান, গত চার মাসে ঝাউগাছ কেটে বন বিভাগের জমি দখল করে একাধিক কটেজ ও বহুতল রিসোর্ট নির্মাণ হয়েছে। রাতে জেনারেটরের আলো ও পর্যটকের বিচরণের কারণে কচ্ছপ সৈকতে ডিম পাড়তে আসছে না। অক্টোবর থেকে মার্চ কচ্ছপের ডিম পাড়ার মৌসুম হলেও চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত কোনো কচ্ছপ ডিম দিতে আসেনি। নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (নেকম) কক্সবাজারের ব্যবস্থাপক আবদুল কাইয়ুম বলেন, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা না হলে সোনাদিয়া সংকটাপন্ন হয়ে পড়বে। ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) জানায়, নতুন করে অন্তত ২৮০ একর সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল হয়েছে।
Sonadia Island 8

ঝাউবন উজাড় করে রিসোর্ট

দ্বীপের পূর্ব পাশে মগচরে সৈকতের তীরে প্রায় পাঁচ একর ঝাউবন উজাড় করে নির্মাণ করা হয়েছে স্যান্ডি বিচ রিসোর্ট। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে পাঁচটি কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে— যেখানে আগে কোনো রিসোর্ট ছিল না। বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ফারুকসহ চার ব্যবসায়ী এই রিসোর্ট নির্মাণ করেছেন।
Sonadia Island 2

প্রশাসনের বক্তব্য

সদ্য বিদায়ী মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হেদায়েত উল্যাহ বলেন, সোনাদিয়ায় নতুন বন বিট চালু হয়েছে এবং অবৈধ নির্মাণ ঠেকাতে পাহারা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং শিগগির অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তারমতে সোনাদিয়ার মতো এত রিসোর্স, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও যা সৃষ্টিকর্তা নিপুণ ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়েছেন। গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা আয়ুব আলী বলেন, সোনাদিয়ার ভূমি এখনো পুরোপুরি বন বিভাগের অনুকূলে ন্যস্ত হয়নি। ভূমি হস্তান্তর হলে পূর্ণ শক্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

** সোনাদিয়া দ্বীপের বনভূমি ফেরত পাচ্ছে বন বিভাগ
** সোনাদিয়া দ্বীপ: প্রকৃতি-পর্যটনের নতুন ঠিকানা
** সোনাদিয়ায় সাত লাখ টন মূল্যবান খনিজ সম্পদ
** প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি সোনাদিয়া