সূর্যমুখী চাষ বাড়লে তেল আমদানি কমবে

সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশে ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, লবণাক্ত উপকূলীয় জমিতে এ ফসলের বড় সম্ভাবনা থাকলেও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে কৃষকদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। দেশের শীর্ষ সূর্যমুখী উৎপাদন এলাকা বরগুনায়ও গত কয়েক বছরে এই ফসলের আবাদ ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে জেলায় ২ হাজার ২৭২ হেক্টর জমিতে ৯ হাজার ২৪৪ জন কৃষক সূর্যমুখী চাষ করেন এবং উৎপাদন হয় ৩ হাজার ৪৮০ টন। ২০২২ সালে আবাদ কিছুটা বেড়ে ২ হাজার ৭৫৩ হেক্টরে পৌঁছায়, ফলে উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়ে ৪ হাজার ১৭১ টনে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে সূর্যমুখী চাষ রেকর্ড গড়ে—সে বছর ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয় এবং উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৮ হাজার ৫৯ টনে উন্নীত হয়। তবে ২০২৩ সালের পর থেকে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ২০২৪ সালে আবাদ কমে ৩ হাজার ৩৮৫ হেক্টরে নেমে আসে এবং উৎপাদন দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫২৯ টন। ২০২৫ সালেও নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকে; সে বছর আবাদ কমে ৩ হাজার ৩৭৬ হেক্টরে এবং উৎপাদন হয় ৬ হাজার ২৪৬ টন। চলতি বছরে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়ে সূর্যমুখী চাষ নেমে এসেছে ৩ হাজার ২০২ হেক্টরে।

কৃষকদের অভিযোগ, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, বাজারজাতকরণ সংকট, মানসম্মত বীজের অভাব এবং বীজ আলাদা করার যন্ত্রের অনুপস্থিতির কারণে তারা এ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অনেকের মতে, উৎপাদন ভালো হলেও বিক্রির নিশ্চয়তা না থাকায় লোকসানের ঝুঁকি থাকে। তালতলীর কৃষক নাঈম হোসেন বললেন, ফলন ভালো হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ায় লাভ হয়নি। সরকার সরাসরি বীজ কিনলে তারা আবার চাষে ফিরবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সূর্যমুখী থেকে তুলনামূলক বেশি তেল পাওয়া যায় এবং এটি কম সেচ ও কম রাসায়নিক সারেই ভালো ফলন দেয়। ফলে এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং পরিবেশবান্ধব ফসল হিসেবে বিবেচিত। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল বোটানি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাইয়ুমের ভাষ্য, ‘বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নিম্নমানের বীজ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবই চাষ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। তিনি সূর্যমুখী চাষে কৃষকদের উৎসাহ বাড়াতে কার্যকর বাজার ব্যবস্থা ও প্রযুক্তি সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।’ ‘এসব বিষয় নিয়ে সরকারকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। তাহলে এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে ব্যাপক সমৃদ্ধি আসবে এবং ভোজ্য তেলের আমদানি-নির্ভরতা অনেকাংশে কমানো যাবে’— যোগ করেন এ অধ্যাপক।

বরগুনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস জানিয়েছেন, আবাদ কিছুটা কমলেও বরগুনা এখনো সূর্যমুখী চাষে দেশের শীর্ষ অবস্থানে। কৃষকদের উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ ও প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তালতলীতে ভর্তুকিতে তেল উৎপাদন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।