বাংলাদেশ সরকার এ বছরের এপ্রিলে স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। তবে বিধিনিষেধ আরোপের পরও আমদানি মাত্র সামান্য কমেছে, কারণ স্থলবন্দর বন্ধ হওয়ায় সমুদ্রবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি শুরু হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি বন্ধ হওয়ার আগের তিন মাসের চেয়ে পরের তিন মাসে ভারত থেকে সুতা আমদানি কমেছে ২ লাখ ৩০ হাজার কেজি। আগে দেশটি থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৫ কোটি কেজি সুতা আসত। বিধিনিষেধ আরোপের পর মে ও জুন মাসে এসেছে গড়ে ৪ কোটি কেজি। জুলাই মাসে আবার সুতা আমদানি ৫ কোটি কেজি ছাড়িয়ে গেছে।
একাধিক বস্ত্রকলের মালিক জানিয়েছেন, স্থলবন্দরে তদারকির অভাবে ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে বেশি সুতা দেশে প্রবেশ করত। কখনও ৩০ কাউন্টের সুতার চালানে ৮০ কাউন্ট সুতা আনা হতো। বন্ড সুবিধায় আসা এসব সুতা স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করতেন অসাধু আমদানিকারকরা, যার ফলে দেশি সুতাকলগুলো বড় লোকসানের মুখে পড়ত। বিধিনিষেধ আরোপের পর ভারত থেকে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে সুতা আমদানি বন্ধ হয়েছে, যা দেশি সুতার চাহিদা বাড়িয়েছে। মালিকরা মনে করেন, অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ করতে চট্টগ্রাম বন্দরে সুতার কাউন্ট পরীক্ষায় কড়াকড়ি আরোপ করা জরুরি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। ১৫ এপ্রিল এনবিআর বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি সুবিধা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারি করে। বাংলাদেশি বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছিলেন, ভারত থেকে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে কম মূল্যে দামি সুতা আসছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ হওয়ার আগে, ৯ এপ্রিল ভারত ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের পণ্য প্রেরণের ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে। পরে ১৭ মে ও ২৭ জুন দুই দফায় পোশাক, খাদ্যপণ্য, পাটপণ্য, তুলা-সুতার বর্জ্য, প্লাস্টিকের পণ্য ও কাঠের আসবাব রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। ১১ আগস্ট আরও কিছুসংখ্যক পাটপণ্যে বিধিনিষেধ জারি করে ভারত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবসায়ী নেতা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপের পর ভারত সরকার ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে তার দেশীয় বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের পণ্য প্রেরণের সুবিধা প্রত্যাহার করেছে।
সুতার ৪৭% আসে ভারত থেকে
তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশে পাঁচ শতাধিক সুতাকল বা স্পিনিং মিল রয়েছে। তারপরও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সুতা আমদানি করতে হয়। তার প্রায় অর্ধেকই ভারত থেকে আসে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ সুতা আসে চীন থেকে।
এনবিআরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে (জানুয়ারি-জুলাই) ৭২ কোটি কেজি সুতা আমদানি হয়। এই সুতা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২২০ কোটি মার্কিন ডলার। আমদানি হওয়া সুতার মধ্যে ভারত থেকে ৪৭ শতাংশ বা ৩৪ কোটি কেজি এবং চীন থেকে ৩৮ শতাংশ বা ২৭ কোটি ৬১ লাখ কেজি এসেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ভারত থেকে যথাক্রমে ৫ কোটি ৫১ লাখ, ৫ কোটি ২১ লাখ ও ৫ কোটি ১৩ লাখ কেজি সুতা আমদানি হয়েছে। এপ্রিলে বিধিনিষেধ আরোপের ফলে আমদানি কমে ৪ কোটি ৫৭ লাখ কেজিতে নেমেছে। পরের দুই মাসে, মে ও জুনে, আমদানি ছিল যথাক্রমে ৪ কোটি ১৫ লাখ ও ৪ কোটি ৫ লাখ কেজি। জুলাই মাসে তা আবার বেড়ে ৫ কোটি ৩৪ লাখ কেজিতে পৌঁছেছে।
জানা গেছে, ভারতের কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও গুজরাট থেকে বাংলাদেশে সুতা আমদানি হয়। আগে বেনাপোল সীমান্তের আশপাশে সুতা মজুত করা হতো এবং আমদানি আদেশের দুই-তিন দিনের মধ্যে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা পণ্য পাঠাতেন। ফলে এক সপ্তাহের মধ্যেই তৈরি পোশাক কারখানাগুলো সুতা পেত। বর্তমানে সমুদ্রবন্দর দিয়ে সুতা আনতে ২০–২৫ দিন সময় লাগছে, যদিও জাহাজে আমদানি করলে খরচ কম হয়।
** স্থলপথে পাটপণ্য আমদানিতে ভারতের নতুন বিধিনিষেধ
** বাংলাদেশের ৯ পণ্য আমদানিতে ভারতের নিষেধাজ্ঞা
** ভারত থেকে স্থলপথে সুতা আমদানি বন্ধ
** ভারতের সাথে টাগবোট কেনার চুক্তি বাতিল
** বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞায় ভারতকে বাংলাদেশের চিঠি
** ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে বড় ঘাটতিতে বাংলাদেশ
** বাংলাদেশি কিছু পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিল ভারত
** বাণিজ্য বিধিনিষেধে বাংলাদেশ নয়, ভারতও ভুগবে
** স্থলবন্দরের মাধ্যমে সুতা আমদানি বন্ধ হচ্ছে
** পেঁয়াজ রপ্তানিতে ২০ % শুল্ক ছাড় দিলো ভারত
** বাজার নিয়ন্ত্রণ: চাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় চায় মন্ত্রণালয়
** আখাউড়া দিয়ে এসেছে ৬০০ টন গম

