সীমান্ত ব্যাংকের ১৩৫ কোটি পরিশোধ করে না লাভেলো

পরিবারসহ এমডির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

সীমান্ত ব্যাংক পিএলসিতে তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম ও তৌফিকা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৩৫ কোটি টাকা। এই টাকা পরিশোধ না করে উল্টো সীমান্ত ব্যাংককে হয়রানি করায় লাভেলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইকরামুল হক ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ব্যাংকের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। যার অংশ হিসেবে দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে মোহাম্মদ ইকরামুল হক, তার স্ত্রী নার্গিস হক, দুই মেয়ে মুহসিনিনা সারিকা ইকরাম ও মুহসিনিনা তারিকা ইকরামের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। বুধবার (২৬ নভেম্বর) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ সাব্বির ফয়েজের আদালত এ আদেশ দেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। দুদকের পক্ষে সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান তাদের দেশত্যাগ নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন।

আবেদনে বলা হয়, ইকরামুল হকের বিরুদ্ধে সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেডের ঋণ পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানকালে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেকোনো সময় বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন। অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের বিদেশ গমন রহিত করা একান্ত প্রয়োজন।

দুদক সূত্রমতে, খেলাপি হয়ে যাওয়া ১৩৫ কোটি টাকা আদায়ে তৌফিকা ফুডস অ্যান্ড লাভেলো আইসক্রিম ও তৌফিকা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইকরামুল হক ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করে সীমান্ত ব্যাংক পিএলসি। ব্যাংকটির অভিযোগের পর দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছে এবং তাদের আবেদনে ইকরামুল হক ও তার পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। ১৭ জুলাই সীমান্ত ব্যাংকের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ মোস্তফা হোছাইন সুমন এই অভিযোগ দায়ের করেন। এর ভিত্তিতে দুদক নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমানকে দায়িত্ব দেয়। পরে গত ২৫ নভেম্বর অনুসন্ধান কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান আদালতে মোহাম্মদ ইকরামুল হক, তার স্ত্রী শামীমা নার্গিস হক এবং তাদের দুই মেয়ে মুহসিনিনা সারিকা ইকরাম ও মুহসিনিনা তৌফিকা ইকরামের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ সাব্বির ফয়েজের আদালত তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুর করেন।

সীমান্ত ব্যাংকের অভিযোগে বলা হয়েছে, ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী কোম্পানিটি সীমান্ত ব্যাংকের শীর্ষ ঋণ খেলাপি। তাদের কাছে ব্যাংকের মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ ১৫২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এসব ঋণ নেওয়া হয়েছিল। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য গত ৬ মার্চ গ্রাহক এবং সীমান্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়। বৈঠকে গ্রাহকের অঙ্গীকার অনুযায়ী, ৩১ মার্চের মধ্যে ৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, ৩০ জুনের মধ্যে মোট ৫৭ কোটি টাকা এবং ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মোট ৭৫ কোটি টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু গ্রাহক তার অঙ্গীকার পালন না করে বৈঠকের পর মাত্র ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। সীমান্ত ব্যাংকের অভিযোগ, গ্রাহক ঋণ পরিশোধ না করে উল্টো ব্যাংকের ঋণ আদায়ের সব পথ বন্ধ করার চেষ্টা করছেন।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যাংকের পাঠানো গত ৫ মের নোটিশের ওপর হাইকোর্ট থেকে ১৯ মে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন ইকরামুল হক। শুধু তাই নয়, সিআইবি প্রতিবেদনে খেলাপি হিসেবে নাম না দেখানোর জন্য হাইকোর্ট থেকে ১৫ মে ছয় মাসের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞাও নেন তিনি। ব্যাংকের অনুকূলে সহায়ক জামানত হিসেবে থাকা শেয়ার বিক্রির ওপরও হাইকোর্ট থেকে ২৬ মে স্থিতাবস্থা জারি করান তিনি। পরে দুই ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইকরামুল হক ও তার পরিবারের সদস্যদের বিদেশ যাত্রার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (৬৩৫৬/২০২৫ এবং ৯২০৫/২০২৫) করেন। তবে হাইকোর্ট শুনানি শেষে গত ২৮ মে ও ২ জুন তারিখে রিট পিটিশন দুটি খারিজ করে দেন। সীমান্ত ব্যাংকের দাবি, তৌফিকা ফুডস ও লাভেলো আইসক্রিম তাদের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে সীমান্ত ব্যাংকের দায় পুরোপুরি প্রদর্শন করছে না। এ কারণে সম্প্রতি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই কোম্পানি ব্যাংকের দায় কম দেখিয়ে এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ দেখিয়ে ইনসাইডার ট্রেডিংসহ নানাভাবে কারসাজি করে শেয়ারের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কারসাজির মাধ্যমে ওই কোম্পানির শেয়ারের দাম ১৫ জুলাই তারিখে ৯৪ টাকা ৮০ পয়সায় ওঠে। বিএসইসি শেয়ারের মূল্যের কারসাজির ওপর আলাদাভাবে তদন্ত শুরু করেছে। ব্যাংকের বকেয়া ঋণ পরিশোধ না করে কোম্পানিটি প্রতিবছর লভ্যাংশও ঘোষণা করে যাচ্ছে। ইকরামুল হক ও তার পরিবারের সদস্যরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করলেও ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের পর্যাপ্ত নগদ অর্থ ও সহজে নগদায়নযোগ্য সম্পদ রয়েছে এবং সম্প্রতি তারা আরও একটি নতুন বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন বলেও জানানো হয়। বিজিবি সদস্য ও বিজিবি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে আমাদের সম্পদের পরিমাণ এবং আর্থিক স্থিতিপত্র বা ব্যালেন্স শিটের আকারও ছোট। গ্রাহকদের খেলাপি ঋণের কারণে ৩০ জুন ব্যাংকের নীট ক্ষতি হয়েছে ১৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ওইসব ঋণ অনাদায়ী হয়ে যাওয়ায় তার বিপরীতে ৯৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এর ফলে বর্তমানে ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতি ও মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় মোহাম্মদ ইকরামুল হক ও তার পরিবারের জন্যই ব্যাংকের স্থায়িত্ব প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

** লাভেলোর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন
** গরমে পাল্লা দিয়ে বড় হচ্ছে আইসক্রিমের বাজার
** ঋণে জর্জরিত লাভেলোর শেয়ার দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি